এইচএসসি বাংলা ১ম পত্র সিরাজউদ্দৌলা পাঠ ১

 পাঠ ১

সিরাজউদ্দৌলা

সিকান্দার আবু জাফর


নাট্যকার-পরিচিতি

সিকান্দার আবু জাফর ১৯১৯ সালের ৩১ মার্চ সাতক্ষীরা জেলার তেঁতুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম সৈয়দ মঈনুদ্দীন হাশেমী, আর মাতা জোবেদা খানম। কবির প্রকৃত নাম ছিল সৈয়দ সিকান্দার আবু জাফর হাশেমী বখত। স্থানীয় তালা বিডি ইনস্টিটিউশন থেকে ১৯৩৬ সনে তিনি মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তিনি কলকাতার বঙ্গবাসী কলেজে কিছুদিন অধ্যয়ন করেন। প্রথমে তিনি কলকাতার একটি সরকারী সংস্থায় চাকরি করেন। ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত তিনি কাজী নজরুল ইসলাম সম্পাদিত দৈনিক নবযুগ পত্রিকার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পৃক্ত হন। 

চাকরি এবং সাংবাদিকতার পাশাপাশি স্বাধীন ব্যবসায়ের প্রতিও তিনি একসময় মনোযোগী হয়ে ওঠেন। ভারত বিভক্তির পর তিনি কলকাতার জীবন ছেড়ে ঢাকায় চলে আসেন। ঢাকায় এসে একদিকে সাহিত্যচর্চা, অন্যদিকে ব্যবসায় মনোনিবেশ করেন তিনি। ১৯৫০ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত তিনি রেডিও পাকিস্তান ঢাকা কেন্দ্রে স্টাফ আর্টিস্ট হিসেবে কাজ করেন। সিকান্দার আবু জাফরের জীবনের একটা বৃহত্তর অংশ জুড়ে আছে তাঁর সাংবাদিক কর্মধারা। কলকাতা থেকে ঢাকায় আসার পরে তিনি দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় সম্পাদীয় বিভাগে কিছুদিন কাজ করেন।

 দৈনিক সংবাদের প্রথম সম্পাদকীয় তাঁরই লেখা। সংবাদের পর তিনি ইত্তেফাক এবং মিল্লাত পত্রিকায়ও সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করেন। ১৯৫৭ সালে সিকান্দার আবু জাফরের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় বিখ্যাত সমকাল পত্রিকা। বাংলাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতির ইতিহাসে সমকাল পত্রিকার অবদান অসামান্য।নতুন লেখক সৃষ্টিতে সমকাল-এর সম্পাদক ও সহকারী সম্পাদক পালন করেন ঐতিহাসিক ভ‚মিকা। ১৯৭১ সালে মুজিবনগর থেকে তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় অভিযান পত্রিকা। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে অভিযান পত্রিকার প্রকাশ একটি দুঃসাহসী এবং ঐতিহাসিক ঘটনা।

 সিকান্দার আবু জাফরের সাহিত্যজীবনও গৌরবোজ্জ্বল কীর্তিতে ভাস্বর। স্কুল জীবন থেকেই তিনি কবিতা লিখতে আরম্ভ করেন। কর্মজীবনের সঙ্গে সঙ্গে অগ্রসর হতে থাকে তাঁর সাহিত্যসাধনা। একে একে প্রকাশিত হতে থাকে তাঁর কাব্য, উপন্যাস, নাটক, ছড়া ও অনুবাদগ্রন্থসমূহ। গীতিকার ও সুরকার হিসেবেও তিনি বিশেষ কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। বাংলাদেশের সাহিত্য সংস্কৃতি এবং প্রগতিশীল আন্দোলনের সঙ্গেও সিকান্দার আবু জাফরের নাম অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। তাঁর ‘আমাদের সংগ্রাম চলবেই চলবে’ গানটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বিপুল প্রেরণার উৎস হয়ে কাজ করেছে।

 বাংলাদেশের সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষের জন্য তাঁর সংগ্রাম ছিল নিরলস ও অকুন্ঠ। নাটকে বিশেষ অবদানের জন্য ১৯৬৬ সালে তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৭৫ সালের ৫ আগস্ট তিনি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। সিকান্দার আবু জাফরের প্রধান সাহিত্যকর্ম : 

কবিতা : প্রসন্ন প্রহর (১৯৬৫), বৈরীবৃষ্টিতে (১৯৬৫), তিমিরান্তিক (১৯৬৫), কবিতা ১৩৭২ (১৯৬৮), কবিতা- ১৩৭৪ (১৯৬৮), বৃশ্চিক লগ্ন (১৯৭১), বাঙলা ছাড়ো (১৯৭২)।

গানের বই : মালব কৌশিক (১৯৬৬)

উপন্যাস : মাটি আর অশ্রæ (১৯৪২), জয়ের পথে (১৯৪৩), পূরবী (১৯৪৪), নতুন সকাল (১৯৪৫)

নাটক : শকুন্ত উপাখ্যান (১৯৫৮), সিরাজউদ্দৌলা (১৯৬৫), মহাকবি আলাউল (১৯৬৬);

অনুবাদ : যাদুর কলস (১৯৫৯), সেন্ট লুইয়ের সেতু (১৯৬১), পশ্চিমের পারাবাত (১৯৬২), রুবাইয়াৎ-ই ওমর খৈয়াম (১৯৬৬), সিংয়ের নাটক (১৯৭১)। 

আরো পড়ুন: এইচএসসি বাংলা ১ম পত্র নাটক :সিরাজউদ্দৌলা 

এই অধ্যায়ের উপর আরো পড়ুন: এইচএসসি বাংলা ১ম পত্র সিরাজউদ্দৌলা পাঠ ১

এই অধ্যায়ের উপর আরো পড়ুন: বাংলা ১ম পত্র নাটক সিরাজউদ্দৌলা সিকান্দার আবু জাফর(Admission Test)

ভূমিকা

সাহিত্যের অন্যতম শাখা নাটক সম্পর্কে আমরা সকলেই কম-বেশি অবহিত আছি। নাটক তুলনামূলকভাবে আধুনিক সাহিত্য শাখা। বাংলা নাটকের বয়স মোটামুটি দুশো বছর। মাধ্যমিক পর্যায়ে আপনারা নাটক পড়েছেন, উচ্চ-মাধ্যমিক স্তরের বাংলা পাঠ্যসূচিতেও নাটক অন্তর্ভুক্ত আছে। এ পর্যায়ে আপনাদের পাঠ করতে হবে সিকান্দার আবু জাফর (১৯১৮-১৯৭৫) বিরচিত ‘সিরাজউদ্দৌলা’ (রচনাকাল : ১৯৫১, প্রকাশকাল : ১৯৬৫) নাটক। 

মূল নাটকে অনুপ্রবেশের পূর্বে নাটকের সংজ্ঞার্থ ও শিল্পরূপ, নাটকের উপাদান ও বৈশিষ্ট্য, বাংলা নাটকের ইতিহাস, সিকান্দার আবু জাফরের জীবন ও সাহিত্যসাধনা, সিরাজউদ্দৌলা নাটক সম্পর্কে প্রাসঙ্গিক তথ্য ইত্যাদি বিষয় আলোচনা করা আবশ্যক। বর্তমান ইউনিটে আমরা উপরের বিষয়সমূহ অনুধাবনে সচেষ্ট হবো। 

সাধারণ উদ্দেশ্য 

  • নাটকের উপাদান, আঙ্গিক ও গঠনকৌশল ব্যাখ্যা করতে পারবে;
  • নাটকের শ্রেণিবিভাগ উদাহরণসহ আলোচনা করতে পারবে;
  • নাটকের উদ্ভব ও বিকাশের ইতিহাস বর্ণনা করতে পারবে;
  • ‘সিরাজউদ্দৌলা’ নাটকের প্রাসঙ্গিক পরিচয় লিখতে পারবে;
  • ‘সিরাজউদ্দৌলা’ নাটকের সম্পূর্ণ কাহিনিটি লিখতে পারবে;
  • ‘সিরাজউদ্দৌলা’ নাটকের ঐতিহাসিক পটভ‚মিকা বর্ণনা করতে পারবে। 

পাঠভিত্তিক উদ্দেশ্য

এ পাঠটি পড়ে তুমি-

  • নাটকের সংজ্ঞার্থ বিশ্লেষণ করতে পারবে;
  • নাটকের গঠনকৌশল আলোচনা করতে পারবে;
  • নাটকের শ্রেণিবিভাগ বর্ণনা করতে পারবে;
  • নাটকের উদ্ভব ও বিকাশের ইতিহাস সম্পর্কে আলোচনা করতে পারবে;
  • বাংলা নাটকের ইতিহাস বর্ণনা করতে পারবে;
  • সিকান্দার আবু জাফরের জীবন ও সাহিত্যসাধনা সম্পর্কে আলোচনা করতে পারবে;
  • ‘সিরাজউদ্দৌলা নাটকের প্রাসঙ্গিক পরিচয় লিখতে পারবে। 

মূলপাঠ

নাটকের সংজ্ঞার্থ

সাহিত্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শাখা হচ্ছে নাটক। গল্প, উপন্যাস, কবিতা, ছড়া, প্রবন্ধ, নাটক- সাহিত্যের এসব বিচিত্র শাখার মধ্যে নাটক এখন সবচেয়ে জনপ্রিয় শিল্পমাধ্যম। দেখা ও শোনার যুগপৎ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই গড়ে ওঠে একটি প্রকৃত নাটক। অর্থাৎ নাটক একই সঙ্গে দেখা ও শোনার বিষয়। এই দুটি মৌল বিষয় নাটকের প্রধান শিল্প-বৈশিষ্ট্য হলেও, আমরা নাট্যগ্রন্থ পাঠ করেও সাহিত্য রস আস্বাদন করতে পারি। 

সহজ কথায় আমরা নিম্নোক্তভাবে নাটককে সংজ্ঞায়িত করতে পারি- মঞ্চে অভিনেতা অভিনেত্রীদের সাহায্যে মানবজীবনের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনা যখন সংলাপের আশ্রয়ে দর্শকের সামনে উপস্থাপন করা হয়, তখন তা হয় নাটক।

ইংরেজিতে বলা হয় " drama is the creation and representation of life in terms of theater

নট, নাট্য, নাটক- এ তিনটি শব্দেরই মূল হলো নট্। আর নট্ এর অর্থ হলো নড়াচড়া করা, অঙ্গচালনা করা ইত্যাদি। নাটকের মধ্যে আমরা অভিনেতা অভিনেত্রীদের কথাবার্তা এবং হাত-পা-মুখ-চোখ নড়াচড়ার মাধ্যমে জীবনের বিশেষ কোনো দিক বা ঘটনার অভিনয় দেখতে পাই। অভিনীত হবার উদ্দেশ্য নিয়ে নাটকের সৃষ্টি হলেও, কেবল পাঠ করেও আমরা নাটকের রস আস্বাদন করতে পারি। তবে মঞ্চে অভিনয়ের মাধ্যমেই নাটকের মৌল উদ্দেশ্য সাধিত হয়। কাজেই নাট্যগ্রন্থ পাঠ করে যে আনন্দ লাভ, নাটকের শিল্পরূপ বিচারে তা মুখ্য নয়, গৌণ বিষয় মাত্র।

নাটকের শিল্পরীতি

যদিও বলা হয়, মানবজীবনের বিশেষ কোনো ঘটনার সংলাপময় শিল্পরূপই নাটক। কিন্তু নাটক হয়ে উঠতে হলে নাট্যকারকে কয়েকটি জরুরি বিষয় মেনে চলতে হয়। এই জরুরি বিষয়গুলোকে নাটকের শিল্পরীতি বলে। বস্তুত, এইসব শিল্পরীতি মেনে চলাই একটি সার্থক নাট্যকর্মের মৌল ভিত্তি। শিল্পরীতির এই বিষয়গুলো হলো- কর্ম বা ক্রিয়ার গতিবেগ

(actionc), সংঘাত (conflict), আকস্মিকতা (unexpectedness), উৎকণ্ঠা (suspense), নাট্যশ্লেষ (dramaticirony) ইত্যাদি।

নাটক জীবনের অনুকরণে নির্মিত হয়, তবে সেই জীবনকেই অনুকরণ করা হয় যে-জীবন কর্মময়, গতিশীল, প্রকৃষ্ট এবং পরিবর্তমান। দর্শক শ্রোতার কৌত‚হল এবং আগ্রহ ধরে রাখাই হচ্ছে গতিবেগ বা অ্যাকশনের মূল কথা। বস্তুত ক্রিয়া বা কর্মের গতিবেগই জীবনের আনন্দকে ধারণ করে। নাটকের এ্যাকশনে কেবল নড়াচড়া বা অগ্র-পশ্চাৎ গতি থাকলেই চলে না, তাতে অবস্থান্তর এবং পরিবর্তনশীলতাও থাকতে হবে।

নাটকের গতি প্রথমত অভিনেতা অভিনেত্রীদের মঞ্চে আসা-যাওয়া এবং অঙ্গ-সঞ্চালনের মাধ্যমে ঘটে থাকে। এ প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে বিখ্যাত নাট্যসমালোচক অজিতকুমার ঘোষ লিখেছেন- “অভিনেতা একভাবে দাঁড়িয়ে বা বসে কথা বললে তা প্রায়ই একঘেঁয়ে ও ক্লান্তিকর হয়ে ওঠে। সেজন্য তাকে আসতে হয়, যেতে হয়, মঞ্চের মধ্যে নড়াচড়া করতে হয়, শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, বিশেষভাবে হাত, মুখ, চোখ ও ভ্রুযুগল সঞ্চালন করতে হয়।  

শুধু আঙ্গিক গতি নয়, বাচিক গতিও নাটকের জন্য প্রয়োজন। এজন্য অভিনেতার কন্ঠস্বর কখনো উচ্চে এবং কখনো বা  ও আকস্মিকভাবে পরিবর্তিত হতে থাকে। এভাবে দর্শন ও শ্রবণেন্দ্রিয়ের মধ্য দিয়ে নাটকের ধপঃরড়হ আমাদের অন্তরের মধ্যে সঞ্চারিত হয়ে আমাদের চিত্তকে কৌত‚হলী ও উত্তেজিত করে রাখে।” বস্তুত, গতির আসল উৎস হলো দর্শকের মনোজগৎ। ভিন্ন ভিন্ন ধরনের নাটকে ভিন্ন ভিন্ন গতিবেগ ফুটিয়ে তুলতে হয়।

 এ কারণে ঐতিহাসিক নাটকে যে ধরনের এ্যাকশন বা গতি ফুটিয়ে তোলা হয়, সামাজিক বা সাঙ্কেতিক নাটকে তা কার্যকর হতে পারে না। গতিবেগ বা অ্যাকশন সৃষ্টির জন্য নাট্যকার প্রথমেই যে কৌশল অবলম্বন করেন, তার নাম পড়হভষরপঃ বা সংঘাত। সংঘাত

নাটকের প্রাণ। নাটকে যদি সংঘাত সৃষ্টি করা না যায়, তাহলে শিল্প হিসেবে তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। নাটকে সংঘাত নানাভাবে দেখা দেয়। গ্রিক নাটকে আমরা দেখি দৈবশক্তি বা নিয়তির সঙ্গে মানুষের দ্ব›দ্ব বা সংঘাত বেধেছে। কখনো কখনো নাটকে সংঘাত দেখা দেয় দু’গুচ্ছ মানুষের মধ্যে। মানুষের সঙ্গে মানুষের এই বিরোধ বা সংঘাতই নাটকের প্রধান উপজীব্য। দুই বিপরীতধর্মী চরিত্রের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়েই নাটকে সংঘাত সৃষ্টি হয়। 

বিপরীতধর্মী দুই গুচ্ছমানুষের এক গুচ্ছ ভালোর প্রতীক, অন্য গুচ্ছ মন্দের প্রতীক। নাটকে সংঘাত যত তীব্র হয়, নাটক হিসেবে তার ততই সার্থকতা। সমাজশক্তির সঙ্গে ব্যক্তিশক্তির দ্বদ্বের ফলেও নাটকে সংঘাত সৃষ্টি হতে পারে। অধিকাংশ নাটকেই আমরা এ ধরনের সংঘাতের সাক্ষাৎ পাই। সমাজনীতি ও যৌনচেতনার বিরোধ, সামাজিক ভেদের কারণে মতান্তর ও মনান্তর, বিবাহ ও ব্যক্তি অধিকারের সংঘাত, যন্ত্র ও জীবনের প্রতিদ্বন্দিতা, মালিক ও শ্রমিকের বিরোধ, সমাজবাদ ও ধনবাদের সংগ্রাম ইত্যাদি নানা কারণে আধুনিক নাটকে সংঘাত সৃষ্টি হয়।

নাটকে অন্য এক ধরনের সংঘাত দেখা যায়। কোন বহিরঙ্গ কারণে নয়, বরং চরিত্র অভ্যন্তরেই এই সংঘাতের বীজ উপ্ত হয়। বস্তুত, এই দ্ব›দ্বই আধুনিক নাটকের প্রধান দ্ব›দ্ব। প্রবৃত্তির সঙ্গে প্রবৃত্তির, সমাজ-চেতনার সঙ্গে ব্যক্তি-চেতনার, হৃদয়বৃত্তির সঙ্গে কর্তব্যবোধের, বুদ্ধির সঙ্গে হৃদয়ের, আদর্শের সঙ্গে বাস্তবের, স্বদেশপ্রেমের সঙ্গে ব্যক্তি-অনুরাগের দ্বদ্ব চরিত্রের অভ্যন্তরে নিয়ত চলতে থাকে। চরিত্রের এই অন্তর্দ্ব›দ্বই নাটকের মূল সংঘাত। যে-কোনো ধরনের নাটকে এই সংঘাত সৃষ্টি করতে হয়।

নাটকে অ্যাকশন বা গতিবেগ সৃষ্টির অপর কৌশল হচ্ছে ঘটনা ও চরিত্র সন্নিবেশে আকস্মিকতার আমদানি করা। রঙ্গ-মঞ্চের অপ্রকাশ্য তিন দিক থেকে চরিত্রের আগমন-নির্গমন বিষয়ে দর্শকের কোনো ধারণা থাকে না বলে নাট্যকার এখানে আকস্মিকতা সৃষ্টির সুযোগ গ্রহণ করে থাকেন। আকস্মিকতার মতো suspense বা উৎকন্ঠাও নাটকের জন্য অপরিহার্য বিষয়। এই উৎকণ্ঠার জন্যই দর্শক পুরো সময় ধরে গভীর বিস্ময় ও উত্তেজনা নিয়ে নাট্যাভিনয় উপভোগ করে থাকেন। 

নাটকে একটি উৎকণ্ঠা তৈরির কিছুক্ষণ পর তার উত্তেজনা শেষ হয়ে যায়। অতঃপর পুনরায় নতুন পরিস্থিতির মাধ্যমে নতুন উৎকণ্ঠা সৃষ্টি করা হয়। এভাবে সাসপেন্স বা উৎকণ্ঠা নাটককে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। উৎকণ্ঠা আছে বলেই নাটকের সঙ্গে দর্শক শ্রোতার এক অদৃশ্য সেতুবন্ধ তৈরি হয়।নাটকীয় অ্যাকশন বা গতিবেগ সৃষ্টির একটি বিশেষ উপায় হলো dramatic irony রৎড়হু বা নাট্যশ্লেষ নির্মাণ। ‘শ্লেষ’ অলঙ্কারে যেমন একটি শব্দের দ্বিবিধ অর্থ থাকে, নাট্যশ্লেষেও তেমনি ঘটনা ও সংলাপের মধ্যে নাট্যকার সুকৌশলে দ্ব্যর্থতার সৃষ্টি করেন।

 নাট্যশ্লেষ দর্শকদের মনে কৌতুক, ব্যঙ্গ ও বেদনা- এসব অনুভ‚তির উদ্রেক করতে পারে। তাই ট্রাজেডি, কমেডি বা যে-কোনো ধরনের নাটকেই আমরা নাট্যশ্লেষ লক্ষ করি। হৃদয়বৃত্তির সঙ্গে কর্তব্যবোধের, বুদ্ধির সঙ্গে হৃদয়ের, আদর্শের সঙ্গে বাস্তবের, স্বদেশপ্রেমের সঙ্গে ব্যক্তি-অনুরাগের দ্বদ্ব চরিত্রের অভ্যন্তরে নিয়ত চলতে থাকে। চরিত্রের এই অন্তর্দ্ব›দ্বই নাটকের মূল সংঘাত। যে-কোনো ধরনের নাটকে এই সংঘাত সৃষ্টি করতে হয়।

নাটকে অ্যাকশন বা গতিবেগ সৃষ্টির অপর কৌশল হচ্ছে ঘটনা ও চরিত্র সন্নিবেশে আকস্মিকতার আমদানি করা। রঙ্গ-মঞ্চের অপ্রকাশ্য তিন দিক থেকে চরিত্রের আগমন-নির্গমন বিষয়ে দর্শকের কোনো ধারণা থাকে না বলে নাট্যকার এখানে আকস্মিকতা সৃষ্টির সুযোগ গ্রহণ করে থাকেন। আকস্মিকতার মতো suspense বা উৎকন্ঠাও নাটকের জন্য অপরিহার্য বিষয়। এই উৎকণ্ঠার জন্যই দর্শক পুরো সময় ধরে গভীর বিস্ময় ও উত্তেজনা নিয়ে নাট্যাভিনয় উপভোগ করে থাকেন। নাটকে একটি উৎকণ্ঠা তৈরির কিছুক্ষণ পর তার উত্তেজনা শেষ হয়ে যায়।

 অতঃপর পুনরায় নতুন পরিস্থিতির মাধ্যমে নতুন উৎকণ্ঠা সৃষ্টি করা হয়। এভাবে সাসপেন্স বা উৎকণ্ঠা নাটককে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। উৎকণ্ঠা আছে বলেই নাটকের সঙ্গে দর্শক শ্রোতার এক অদৃশ্য সেতুবন্ধ তৈরি হয়। নাটকীয় অ্যাকশন বা গতিবেগ সৃষ্টির একটি বিশেষ উপায় হলো dramatic irony রৎড়হু বা নাট্যশ্লেষ নির্মাণ। ‘শ্লেষ’ অলঙ্কারে যেমন একটি শব্দের দ্বিবিধ অর্থ থাকে, নাট্যশ্লেষেও তেমনি ঘটনা ও সংলাপের মধ্যে নাট্যকার সুকৌশলে দ্ব্যর্থতার সৃষ্টি করেন।

 নাট্যশ্লেষ দর্শকদের মনে কৌতুক, ব্যঙ্গ ও বেদনা- এসব অনুভ‚তির উদ্রেক করতে পারে। তাই ট্রাজেডি, কমেডি বা যে-কোনো ধরনের নাটকেই আমরা নাট্যশ্লেষ লক্ষ করি।  নাটকের আঙ্গিক ও উপাদান  নাটকের সঙ্গে দর্শক ও শ্রোতার সম্পর্ক সরাসরি ও প্রত্যক্ষ। সাহিত্যের অন্যান্য শাখা মানুষ একাকী যখন ও যেভাবে ইচ্ছা উপভোগ করতে পারে, কিন্তু নাটক উপভোগ করতে হয় নির্দিষ্ট স্থানে ও নির্দিষ্ট সময়ে এবং সম্মিলিতভাবে। এ জন্যে অন্যান্য সাহিত্য শাখা থেকে নাটকের আঙ্গিক ও গঠনকৌশল সম্পূর্ণ আলাদা এবং বিশেষ নিয়ম-নীতি দ্বারা সুনির্দিষ্ট।

প্রতিটি নাটকের মধ্যে চারটি প্রধান উপাদান থাকে। এগুলো হচ্ছে-

১. কাহিনি বা বিষয়

২. চরিত্র

৩. সংলাপ

৪. পরিবেশ। 

একজন নাট্যকারকে নাটক রচনার সময় এ-চারটি উপাদানের প্রতি বিশেষভাবে লক্ষ রাখতে হয়। প্রতিটি নাটকে একটি নির্দিষ্ট কাহিনি থাকে। মানবজীবন মূল অবলম্বন হলেও মানুষের সম্পূর্ণ জীবন নাটকে উপস্থাপিত হয় না। জীবনের বিশেষ কোনো ঘটনা বা বিষয়কে অবলম্বন করে নাট্যকার নাটক রচনা করেন। নাট্যকারকে সব সময় মনে রাখতে হয় যে, নাটক নির্দিষ্ট একটি মঞ্চে অভিনেতা-অভিনেত্রী দ্বারা অভিনীত হবে। 

তাই কাহিনির মধ্যে এমন কিছু আনা যাবে না, যা মঞ্চে উপস্থাপন করা সম্ভব নয়। এছাড়া নাটকের অভিনয় সাধারণত ৬০ থেকে ৯০ মিনিট, কিংবা সর্বোচ্চ ১২০ মিনিটের মধ্যে শেষ হয়ে থাকে। তাই কাহিনি এতোটা বড় করা যায় না, যা অভিনীত হতে এর চেয়ে বেশি সময় প্রয়োজন হয়। কাহিনিকে সাজাতে হলে চরিত্রের প্রয়োজন। কারণ বিশেষ বিশেষ চরিত্র ছাড়া নাটকের কাহিনি দাঁড়াবে কীভাবে? তাই নাট্যকারকে প্রথমেই কতিপয় চরিত্র নির্বাচন করতে হয়। নাটকে একটি, কখনো বা দুটি প্রধান চরিত্র থাকে। 

প্রধান চরিত্রকে কেন্দ্র করেই নাট্যঘটনা বিকশিত হয়। কিন্তু প্রধান চরিত্র তো একা একা কথা বলতে পারে না। তাই তার সঙ্গে সঙ্গে আসে আরও কিছু চরিত্র। এরা সবাই মিলে নাটকের কাহিনিকে পরিণতির দিকে নিয়ে যায়। পৃথিবীর যে-কোনো সমস্যায় কমপক্ষে দুটি পক্ষ থাকে। একপক্ষ বিশেষ একটি কাজকে সমর্থন করে, অন্যপক্ষ করে তার বিরোধিতা। এ দু’পক্ষের দ্ব›দ্ব ও বিরোধের মধ্য দিয়েই নাট্যকাহিনিতে চরিত্র বিকশিত হয়। ট্রাজেডির চরিত্র কেমন হবে সে সম্পর্কে এ্যারিস্টটল যা বলেছেন, তা মূলত সকল নাটকের চরিত্র সম্পর্কেই প্রযোজ্য। তাঁর মতে, চরিত্রের থাকতে হবে নিম্নক্ত গুণাবলি−

 ক. নাটকের চরিত্রের মাঝে ভাল ও মন্দের সমাবেশ থাকবে;

 খ. নাটকের চরিত্রকে হতে হবে যথাযথ;

 গ. নাটকের চরিত্রকে হতে হবে বাস্তব; 

ঘ. নাটকের চরিত্রকে হতে হবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

নাটকের মধ্যে অনেক চরিত্র থাকতে পারে, কিন্তু নাটকের গতি প্রধানত একটি কি দুটি প্রধান চরিত্রকে কেন্দ্র করে বিকশিত হয়। প্রধান চরিত্রের উপরই নাটকের সার্থকতা বহুল পরিমাণে নির্ভর করে। তাই প্রধান চরিত্র রূপায়ণে নাট্যকারকে দক্ষতার পরিচয় দিতে হয়। কাহিনি আর চরিত্র তো পাওয়া গেল, এখনো কিন্তু নাটক হলো না। কারণ চরিত্রগুলো এখনো কথা বলতে পারছে না। কথা বলার জন্য চাই সংলাপ। সংলাপ কাহিনি ও চরিত্রকে সুস্পষ্ট করে পরিণতির দিকে নিয়ে যায়। এক চরিত্রের সঙ্গে অন্য চরিত্রের সংলাপ বিনিময়ের মধ্য দিয়েই নাট্যকাহিনি বিকশিত হয়। বস্তুত সংলাপের মাধ্যমে তিনটি বিশেষ প্রয়োজন সাধিত হয়। এগুলো হচ্ছে−

 ক. নাট্যকারের বক্তব্য প্রকাশ ও প্রমাণ করার জন্য সংলাপ;

 খ. চরিত্রসমূহের প্রকাশ ও বিকাশের জন্য সংলাপ;

 গ. নাটকের দ্ব›দ্বকে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য সংলাপ।

সংলাপ নাটকের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সংলাপের মাধ্যমেই নাট্য পরিস্থিতি নির্মিত হয়। সংলাপ ব্যর্থ হলে, নাট্যরস ক্ষুণু হয়ে পড়ে। গল্প বা উপন্যাসে বর্ণনার অবকাশ আছে, সেখানে গল্পকার বা ঔপন্যাসিকও কথা বলতে পারেন। কিন্তু নাটকে সে সুযোগ থাকে না। নাট্যকারকে এখানে সংলাপের মাধ্যমেই সব কাজ করতে হয়। সংলাপের মাধ্যমেই যেহেতু নাট্যকাহিনি বিকশিত হয়, তাই সংলাপের ভাষা কেবল চরিত্র ও পরিবেশ অনুযায়ী হলেই চলে না। ভাষার মধ্য দিয়ে আবেগ, দ্বাদ্ব, উৎকণ্ঠা প্রভৃতিও ফুটিয়ে তুলতে হয়। সেজন্য সংলাপের শব্দপ্রয়োগ, বাক্যবিন্যাস, বিভিন্ন বাক্যের পারিবারিক সংযোগ ইত্যাদিতেও নাট্যকারকে সতর্ক ও যতœবান হতে হয়।

 সংলাপের ভাষা অবিকল বাস্তব হলে চলে না। সংলাপের ভাষা হলো শিল্পের ভাষা। তাই সংলাপের ভাষাকে একটু সাজিয়ে, বর্ণ ও সুরের সমাবেশে ফুটিয়ে তুলতে হয়। নাটকের সংলাপ কখনো গদ্যরীতি, কখনও বা পদ্যরীতি অবলম্বন করে রচিত। নাটকের বিষয়বস্তু এবং নাট্যরসের দাবি অনুযায়ী যে-কোনো একটি রীতি সংলাপে ব্যবহৃত হয়। গ্রিক নাটকের ভাষায় পদ্যরীতি ব্যবহৃত হয়েছে, শেক্সপিয়ারের নাটকেও পদ্যরীতির ব্যবহার ঘটেছে। কিন্তু আধুনিককালে আমরা নাটকের সংলাপে সাধারণত গদ্যভাষার ব্যবহারই লক্ষ করি। 

তবে একালেও বিষয়ের প্রয়োজনে অনেক নাটকের সংলাপে পদ্যরীতির ব্যবহার লক্ষণীয়। নাটকের কাহিনি, চরিত্র ও সংলাপকে অর্থবহ ও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার জন্য নাট্যকার পরিবেশ তৈরি করেন। নাচ, গান,  শব্দ সংযোজন, আলোকবিন্যাস, কাহিনি অনুযায়ী দৃশ্য ও মঞ্চসজ্জা এবং মঞ্চনির্মাণ কৌশলের মাধ্যমে নাটকের পরিবেশ নির্মাণ করা হয়। পরিবেশ যথাযথ না হলে নাটকের শিল্পগুণ ক্ষুণœ হয়। তাই পরিবেশ নির্মাণের প্রতি নাট্যকারকে খুবই সতর্ক থাকতে হয়। নাট্যকারের এমন কোন পরিবেশ নির্মাণ করা উচিত নয়, যা মঞ্চে উপস্থাপন করা অসম্ভব। এই চারটি উপাদান মিলেই গড়ে ওঠে একটি নাটক। গ্রিক নাটকে কাহিনির প্রাধান্য বেশি, পক্ষান্তরে শেক্সপিয়রের নাটকে দেখি চরিত্রের প্রাধান্য। 

নাটকের গঠনকৌশল

নাটকের গঠনকৌশল নিয়ে সর্বপ্রথম আলোচনা করেন গ্রিক মনীষী এ্যারিস্টটল। প্রাচীন গ্রিক নাটকগুলো পরীক্ষা করে নাটকের সংগঠন এবং শৈলী সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত আলোচনা করেন। তাঁর মতে, তিনটি বিষয়ের ঐক্যই একটি নাটকের গঠনকৌশলের প্রধান ভিত্তি। এই ঐক্যত্রয় নিম্নরুপ−

১. কালের ঐক্য;

২. স্থানের ঐক্য;

৩. ঘটনার ঐক্য

কালের ঐক্য বলতে আমরা বুঝি, নাটক যত সময় মঞ্চে অভিনীত হবে, সে সময়ের মধ্যে যা কিছু ঘটা সম্ভব, নাটকে কেবল তা-ই ঘটানো যাবে। অর্থাৎ ঘটনার বিশ্বস্ততা এবং মঞ্চ-যোগ্যতা নাট্যকারকে অক্ষুণ্ণ রাখতে হয়। এ্যারিস্টটল বলেছেন, ২৪ ঘন্টার মধ্যে নাট্যকাহিনিকে সীমাবদ্ধ হতে হবে। তবে এ তত্ত¡ আধুনিক কালের নাটকে সর্বাংশে প্রযোজ্য নয়। 

স্থানের ঐক্য হলো, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নাট্যচরিত্রসমূহ যতটা স্থান পরিবর্তন করতে পারে, নাটকে ততটাই দেখানো যাবে। এর চেয়ে বেশি স্থানান্তর নাটকের জন্য অপ্রয়োজনীয়। নাটকে এমন কোনো স্থানের উল্লেখ থাকতে পারবে না, যেখানে নাট্য নির্দেশিত সময়ের মধ্যে চরিত্রসমূহ যাতায়াত করতে পারে না। ঘটনার ঐক্য হলো, নাটকে এমন কোনো ঘটনা দেখানো যাবে না, যা মূল ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে অতিরিক্ত বা অপ্রয়োজনীয় বলে মনে হয়। এ্যারিস্টটলের মতে, অপ্রয়োজনীয় ঘটনার সমাবেশ নাটকের শিল্পগুণ নষ্ট করে। 

ঘটনার ঐক্য সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে প্রখ্যাত সমালোচক শ্রীশচন্দ্র দাশ লিখেছেন “নাটকে এমন কোনো দৃশ্য বা চরিত্র সমাবেশ থাকিবে না, যাহাতে মূল সুর ব্যাহত হইতে পারে। সমস্ত চরিত্র ও দৃশ্যই নাটকের মূল বিষয় ও সুরের পরিপোষক রূপে প্রদর্শিত হওয়া চাই ......।” ওপরের তিন ধরনের ঐক্যের মধ্যে এ্যারিস্টটল তাঁর  on the art of poetry গ্রন্থে ঘটনার ঐক্যের ওপরেই সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছেন। তাঁর মতে, ঘটনার ঐক্যের প্রতি নাট্যকারকে খুবই মনোযোগী থাকতে হয়। 

আধুনিক কালে এই ত্রিমাত্রিক ঐক্যের সঙ্গে নতুন এক প্রকার ঐক্য আমরা কোনো কোনো নাটকে লক্ষ করি। একে বলা হয় চরিত্রের একত্ব । একটি মাত্র চরিত্রকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা নাটকেই আমরা এই ঐক্য দেখতে পাই। এ ধরনের নাটকের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বিনি পয়সার ভোজ’, নুরুল মোমেনের ‘নেমেসিস’, আব্দুল্লাহ আল মামুনের ‘কোকিলারা’, ইউজিন ও নীল-এর ‘দি ব্রেক ফাস্ট’, জাঁ ককতুর ‘দি হিউম্যান ভয়েস’ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

মূল নাট্যকাহিনিকে এ্যারিস্টটল আদি, মধ্য এবং অন্ত্য এই তিন পর্যায়ে বিভক্ত করেছেন। একই সঙ্গে ঐ তিনটি পর্যায়ের মধ্যে তিনি অখন্ড সমন্বয়ের কথাও বলেছেন। নাট্যকাহিনি বিকাশের ক্রমকে অনুসরণ করেই আদি, মধ্য ও অন্ত্য পর্ব বিবেচনা করা হয়। খুব সংক্ষেপে আমরা বলতে পারি− নাট্যসমস্যার উপস্থাপনা, চরিত্রের পরিপ্রেক্ষিত উম্মোচন এবং মূল সমস্যায় অনুপ্রবেশের পূর্বাবস্থা হলো আদি পর্যায়। মধ্য পর্যায়ে নাট্যদ্বাদ্ব ঘনীভ‚ত হয়ে ওঠে এবং মূল সঙ্কটের একটি চ‚ড়ান্ত নাট্যমুহূর্ত নির্মিত হয়।

 অন্ত্যপর্বে অতি দ্রুত কাহিনির পরিসমাপ্তি ঘটে। এ্যারিস্টটলের মতে, নাট্যকাহিনির এই তিন পর্বের মধ্যে গভীর ঐক্য ও সমন্বয় থাকা প্রয়োজন।এখানে একটি কথা আপনার মনে রাখা প্রয়োজন, উপরের তিনটি ঐক্যের মধ্যে স্থান ও কালের ঐক্য মেনে নিয়ে নাটক রচনা রীতিমতো দুরূহ কাজ। স্থান ও কালের ঐক্য মেনে চললে নাটকের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাপ্রাপ্ত হতে পারে। তাই আধুনিক কালের নাটকে আপনি ঐ দু’ধরনের ঐক্য তেমন লক্ষ করবেন না।

 এমনকি উইলিয়ম শেক্সপিয়রও তাঁর নাটকে স্থান ও কালের ঐক্য সর্বদা মেনে চলেননি। তবে ঘটনার ঐক্য নাটকের জন্য অনিবার্য শর্ত। ঘটনার ঐক্য বিনষ্ট হলে নাটক কিছুতেই সার্থক হবে না। মোটকথা, বিষয়ের প্রয়োজনেই নাট্যকারেরা নির্বাচন করে নেন তাঁরা কতটুকু ও কোন মাত্রায় ত্রয়ী ঐক্যনীতি অনুসরণ করবেন। এ ক্ষেত্রে চ‚ড়ান্ত কথা হলো, তাঁরা ঐক্যনীতি যেভাবে এবং যতটুকুই মেনে চলেন না কেন, দেখতে হবে মূল নাট্যরস যেন কিছুতেই বাধাপ্রাপ্ত না হয়।  একটি নাটকের গঠনকে প্রধানত পাঁচটি পর্বে বিভক্ত করা যায়। এই পর্বগুলো নিম্নরুপ

১. কাহিনির আরম্ভ-- exposition [মুখ]

২. কাহিনির ক্রমব্যাপ্তি--rising action [প্রতিমুখ]

৩. উৎকর্ষ বা চড়ান্ত দ্বন্দ-- climax [গর্ভ]

৪. গ্রন্থিমোচন-- falling action বিমর্ষ]

৫. যবনিকাপাত-- conclusion [উপসংহার] 

উপর্যুক্ত পাঁচটি পর্যায়কে অবলম্বন করেই রচিত হয় পঞ্চাঙ্ক নাটক। এক-একটি পর্যায় নিয়ে লেখা হয় এক-একটি অঙ্ক। এ্যারিস্টটলের মতে, পঞ্চাঙ্ক নাটকই হচ্ছে আদর্শ নাটক। নাটকের প্রথম অঙ্কে আখ্যানভাগের সূচনা এবং নাট্যিক দ্বন্দের পরিপ্রেক্ষিত বর্ণিত হয়। দ্বিতীয় অঙ্কে আখ্যানের জটিলতা এবং নাট্যদ্ব বিস্তার লাভ করে। তৃতীয় অঙ্কে বর্ণিত হয় ঘটনার ঘনীভ‚ত অবস্থা এবং চরম নাট্যোৎকর্ষ। এখানেই নাট্যদ্বন্দের চূড়ান্ত রূপ বর্ণিত হয়। চতুর্থ অঙ্কে আস্তে আস্তে নাট্য- জটিলতার জট খুলতে থাকে। পঞ্চম অঙ্কে বর্ণিত হয় নাট্যকাহিনির সমাপ্তি বা উপসংহার। 

একটি পঞ্চাঙ্ক নাটকের কাহিনিধারা অনুসরণ করলে উপর্যুক্ত পঞ্চাঙ্ক নাটকের বিভাজন অনুধাবন করা আপনার কাছে সহজ হতে পারে।  এ উদ্দেশ্যে আমরা দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের বিখ্যাত নাটক ‘সাজাহান’-এর কাহিনিক্রম বিশ্লেষণ করতে পারি। ‘সাজাহান’ নাটকের অঙ্ক- বিভাজন নিম্নরুপ

প্রথম অঙ্ক : দিল্লীর সিংহাসন লাভের জন্য সাজাহানের পুত্রদের মাঝে বিদ্রোহ। বিদ্রোহ দমন করে বিজয়ী ঔরঙ্গজেব আগ্রায় প্রবেশ করে বৃদ্ধ পিতা সাজাহানকে বন্দী করেন।

দ্বিতীয় অঙ্ক : ঔরঙ্গজেব দিল্লীর সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং মোরাদকে বন্দি করেন। পরাজিত দারা রাজপুতানার মরুভ‚মিতে সপরিবারে মৃত্যুর জন্য প্রতীক্ষা করতে থাকেন। ঔরঙ্গজেব কর্তৃক সুজার বিরুদ্ধে সৈন্য প্রেরণ।

তৃতীয় অঙ্ক : গুজরাটের সুবেদার সাহাবাজের দারার পক্ষ অবলম্বন। ঔরঙ্গজেব যশোবন্ত সিংহকে গুর্জরের সুবেদারির লোভ দেখিয়ে দারার পক্ষ থেকে সরিয়ে আনা।

চতুর্থ অঙ্ক : পরাজিত ও ধৃত দারাকে ঔরঙ্গজেব কারাদন্ড প্রদান করেন। জিহন খাঁ দারার ছিন্নমুন্ড এনে ঔরঙ্গজেবকে উপহার প্রদান করেন।

পঞ্চম অঙ্ক : দারার পুত্র সোলেমান বন্দি হলেন। সুজা আরাকানে আশ্রয় গ্রহণ করেন। দারার মৃত্যুতে সাজাহানের উম্মাদ অবস্থা। অনুতাপদগ্ধ ঔরঙ্গজেব পিতা সাজাহানের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। বৃদ্ধ পিতা মাতৃহীন পুত্রকে ক্ষমা করলেন এবং এভাবে নাটকের পরিসমাপ্তি ঘটলো। এ্যারিস্টটল পঞ্চাঙ্ক নাটকের কথা বললেও, আধুনিক কালে উপর্যুক্ত পাঁচটি পর্যায় পাঁচের চেয়ে কম অঙ্কে ধারণ করেও নাটক রচিত হচ্ছে। আধুনিক নাট্যকারেরা তিন অঙ্কে নাটক রচনা করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। কখনো বা এক অঙ্কের পরিসরেই পাঁচটি পর্যায়কে ধারণ করে উৎকৃষ্ট নাটক লেখা হচ্ছে। 

এ প্রসঙ্গে আমরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রক্তকরবী’ এবং নুরুল মোমেনের ‘নেমেসিস’ নাটকের কথা বলতে পারি। এক অঙ্ক এবং এক দৃশ্যে রচিত হলেও উপর্যুক্ত নাট্যদ্বয়ে অদৃশ্য পঞ্চসন্ধি (পাঁচটি পর্যায়) সহজেই নির্দেশ করা যায়। নাটকের মূল লক্ষ্য হলো নাট্যকাহিনির বিকাশ ও চরিত্রের দ্ব›দ্ব-সংঘাত নির্মাণ। এদিকে লক্ষ রেখেই নাট্যকার তাঁর নাটকের সংগঠন নির্মাণ করেন। অঙ্ক ভাগের গাণিতিক হিসেব দিয়ে জীবনের হিসেব সর্বদা মেলে না। তাই সৃজনশীল নাট্যকার প্রায়শই নতুন নতুন গঠনশৈলী নির্মাণ করে নাট্যসাহিত্যের বিকাশের ধারা অক্ষুণ্ণ রাখেন। 

নাটকের শ্রেণিবিভাগ

মুক্তিযুদ্ধের নাটক

 মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে যাঁরা নাটক লিখেছেন তাঁদের মধ্যে আছেন-- মমতাজউদদীন আহমদ-- স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা’ (১৯৭৬), ‘বকুলপুরের স্বাধীনতা’ (১৯৮৬), বিবাহ ও কী চাহ শঙ্খচিল’ (১৯৮৫); সৈয়দ শামসুল হক-- ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’; জিয়া হায়দার− ‘সাদা গোলাপে আগুন’ (১৯৮২), ‘পঙ্কজ বিভাস’ (১৯৮২); আলাউদ্দিন আল আজাদ- ‘নিঃশব্দ যাত্রা’ (১৯৭২), ‘নরকে লাল গোলাপ’ (১৯৭৪); মোহাম্মদ এহসানুল্লাহ- ‘কিংশুক যে মরুতে’ (১৯৭৪); নীলিমা ইব্রাহিম- ‘হে জনতা আরেক বার’ (১৯৭৪) প্রমুখ।  উপর্যুক্ত নাটকসমূহে আমাদের গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধের নানা খন্ড চিত্র উপস্থাপিত হয়েছে- কখনো আবেগী ভাষ্যে, কখনো বা শিল্পিত পরিচর্যায়। 

প্রতিবাদের নাটক, প্রতিরোধের নাটক 

 প্রতিবাদ আর প্রতিরোধ চেতনাই বাংলাদেশের নাটকের প্রধান প্রবণতা। এ ধারায় উল্লেখযোগ্য নাটকসমূহ হচ্ছে মামুনুর রশীদের ‘ওরা কদম আলী’ (১৯৭৮), ‘ইবলিস’ (১৯৮২), ‘এখানে নোঙর’ (১৯৮৪), ‘গিনিপিগ’ (১৯৮৬); আবদুল্লাহ আল মামুনের ‘শপথ’ (১৯৭৮), ‘সেনাপতি’ (১৯৮০), ‘এখনও ক্রীতদাস’ (১৯৮৪); মমতাজউদদীন আহমদের ‘সাতঘাটের কানাকড়ি’ (১৯৯১); সেলিম আল দীনের ‘করিম বাওয়ালীর শত্রু বা মূল মুখ দেখা’ (১৯৭৩), ‘কিত্তনখোলা’ (১৯৮৬); রাজীব হুমায়ুনের ‘নীলপানিয়া’ (১৯৯২); আবদুল মতিন খানের ‘মাননীয় মন্ত্রীর একান্ত সচিব; (১৯৮০); এস.এম সোলায়মানের ‘ইঙ্গিত’ (১৯৮৫) ‘এই দেশে এই বেশে’ (১৯৮৮) ইত্যাদি। 


ইতিহাস-ঐতিহ্য পুরাণ, পুনর্মূল্যায়নধর্মী নাটক

 মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর কালে ইতিহাস-ঐতিহ্য-পুরাণের অনুষঙ্গে নাটক রচনায় সঞ্চারিত হয় নতুন মাত্রা। এ ধারায় উল্লেখযোগ্য নাটকসমূহ হচ্ছে- সৈয়দ শামসুল হকের ‘নূরলদীনের সারাজীবন (১৯৮২);  সাঈদ আহমদের ‘শেষ নবাব’ (১৯৮৯); মমতাজউদদীন আহমদের ‘স্পার্টাকাস বিষয়ক জটিলতা’ (১৯৭৬); সেলিম আল দীনের ‘অনিকেত অন্বেষণ’, ‘শকুন্তলা’ (১৯৮৬) ইত্যাদি।

সামাজিক নাটক 

 স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের নাট্যসাহিত্যের অন্যতম প্রবণতা বিদেশি নাটকের অনুবাদ ও রূপান্তরকরণ। ১৯৭১ পরবর্তীকালে শেক্সপিয়র, মলিয়ের, মোলনার, বেকেট, ইয়োসেনেস্কো, ব্রেখট, সার্ত, কাম্যু, এ্যালবি প্রমুখ নাট্যকারের নাটক অনূদিত কিংবা রূপান্তরিত হয়েছে। অনুবাদ ও রূপান্তরকরণে যাঁরা উল্লেখযোগ্য ভ‚মিকা পালন করেছেন, তাঁদের মধ্যে আছেন কবীর চৌধুরী, সৈয়দ শামসুল হক, মমতাজউদ্দীন আহমদ, আলী যাকের, জিয়া হায়দার, খায়রুল আলম সবুজ, আসাদুজ্জামান নূর, আবদুস সেলিম প্রমুখ।

নর্বাচিত নাটক প্রসঙ্গ

সিকান্দার আবু জাফরের ‘সিরাজউদ্দৌলা’ নাটক প্রথম প্রকাশিত হয় ডিসেম্বর ১৯৬৫ সালে (পৌষ ১৩৭২)। ১৭৫৭ সালে পলাশির যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় ও পতনকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে আলোচ্য নাটক। ইতিহাসের ধূসর আবর্ত থেকে কাহিনির মৌল উপাদান গৃহীত হলেও, সিকান্দার আবু জাফর অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে আলোচ্য নাটকে বর্তমান কালের জীবন-জিজ্ঞাসাকে ইতিহাসের কাঠামোর মধ্যে প্রতিস্থাপন করেছেন। তাঁর হাতে পলাশির ইতিহাস পুনর্জীবন লাভ করেছে।

বাঙালির স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা আর সংগ্রামশীল সত্তা প্রকাশের আগ্রহ থেকেই নাট্যকারের সিরাজউদ্দৌলা স্মরণ। সিরাজউদ্দৌলা’ নাটকের ভ‚মিকায় সিকান্দার আবু জাফরের অভিমত এ প্রসঙ্গে বিশেষভাবে স্মরণীয়- “জাতীয় জাগরণের প্রয়োজনে উদ্দীপনার প্রেরণা হিসেবে সিরাজউদ্দৌলা জাতীয় বীরের আসন লাভ করেছেন। স্বাধীনতা সংগ্রামের নির্ভীক নায়ক রূপে সিরাজউদ্দৌলা আজ সর্বজনপ্রিয় চরিত্র। এই সাফল্যের পথ প্রসারিত হয়েছে জাতীয় নাট্যান্দোলনের মাধ্যমে।

জাতীয় চেতনা নতুন খাতে প্রবাহিত হয়েছে। কাজেই নতুন মূল্যবোধের তাগিদে ইতিহাসের বিভ্রান্তি এড়িয়ে জাতীয় প্রেরণার উৎস হিসেবে সিরাজউদ্দৌলাকে আমি নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে আবিষ্কারের চেষ্টা করেছি। একান্তভাবে প্রকৃতই ইতিহাসের কাছাকাছি থেকে এবং প্রতি পদক্ষেপে ইতিহাসকে অনুসরণ করে আমি সিরাজউদ্দৌলার জীবননাট্য পুননির্মাণ করেছি। ধর্ম এবং নৈতিক আদর্শে সিরাজউদ্দৌলার যে অকৃত্রিম বিশ্বাস, তাঁর চরিত্রের যে দৃঢ়তা এবং মানবীয় সদগুণগুলিকে চাপা দেবার জন্য ঔপনিবেশিক চক্রান্তকারীরা ও তাদের স্বার্থান্ধ স্তাবকেরা অসত্যের পাহাড় জমিয়ে তুলেছিল, এই নাটকে প্রধানত সেই আদর্শ এবং মানবীয় গুণগুলিকেই আমি তুলে ধরতে চেয়েছি।”

নাট্যকারের উপর্যুক্ত বক্তব্য থেকেই আপনি অনুধাবন করতে পারবেন কেন তিনি সিরাজউদ্দৌলার ইতিহাসখ্যাত কাহিনি নিয়ে আলোচ্য নাটকটি লিখেছেন। সিরাজউদ্দৌলার চরিত্রে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশরা যেসব কলঙ্ক লেপন করতে চেয়েছিল, সিকান্দার আবু জাফর সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের কথা বলতে গিয়ে সে কলঙ্ককে মোচনের চেষ্টা করেছেন। ইতিহাসকে অবলম্বন করে তিনি নতুন করে ইতিহাস লেখেননি, বরং নির্মাণ করেছেন কালজয়ী সাহিত্য। ১৯৬৫ সালে আইয়ুবী শাসনের যাঁতাকলে পূর্ববাংলার মানুষ যখন দিশেহারা, তখন সিকান্দার আবু জাফরের এই নাটক রচনা ভিন্নতর মাত্রা নির্দেশকও বটে।

 তিনি চেয়েছেন সিরাজউদ্দৌলার শক্তি আর সাহস আর দেশপ্রেমকে পূর্ববাংলার জনগোষ্ঠীর মধ্যে ছড়িয়ে দিতে, যাতে তারা সঙ্ঘবদ্ধভাবে পশ্চিম পাকিস্তানী শোষণ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে পারে। এই সূত্রে আলোচ্য নাটক রচনা ও প্রকাশ নিঃসন্দেহে একটি সাহসী কর্ম। সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় ও পতনকে নিয়ে সিকান্দার আবু জাফরের পূর্বে এবং পরে একাধিক নাট্যকার নাটক রচনা করেছেন। বর্তমান আলোচনায় সে সব নাটকের সংক্ষিপ্ত পরিচয় প্রদানও এখানে প্রাসঙ্গিকভাবে আপনার জানা প্রয়োজন।

সিরাজউদ্দৌলার ট্র্যাজিক ইতিহাস নিয়ে প্রথম নাটক রচনা করেন গিরিশচন্দ্র ঘোষ। তাঁর নাটক প্রকাশিত হয় ১৯০৬ সালে। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময়ই(১৯০৫) তিনি এই নাটক রচনার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এই নাটকেও গিরিশচন্দ্র সিরাজউদ্দৌলার চরিত্রে আরোপিত কলঙ্কমোচনের চেষ্টা করেছেন। প্রসঙ্গত স্মরণীয় তাঁর অভিমত- ‘বিদেশি ইতিহাসে সিরাজ চরিত্র বিকৃত বর্ণে চিত্রিত হইয়াছে। সুপ্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক বিহারীলাল সরকার, শ্রীযুক্ত অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়, শ্রীযুক্ত নিখিলনাথ রায়, শ্রীযুক্ত কালী প্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায় প্রভৃতি শিক্ষিত সুধিগণ অসাধারণ অধ্যবসায় সহকারে বিদেশি ইতিহাস খন্ড করিয়া রাজনৈতিক ও প্রজাবৎসল সিরাজের স্বরূপ চিত্র প্রদর্শনে যত্নশীল হন।

’ এভাবে সিরাজ-চরিত্র গিরিশচন্দ্র ঘোষের হাতে নতুন মহিমা ও মর্যাদা নিয়ে আবিভর্‚ত হলো।  সিরাজউদ্দৌলার ট্র্যাজিক পরিণতি নিয়ে সবচেয়ে মঞ্চসফল ও বহুল পঠিত নাটক রচনা করেছেন শচীন সেনগুপ্ত। বস্তুত, শচীন সেনগুপ্তের ‘সিরাজউদ্দৌলা’ নাটকই বাংলার রঙ্গমঞ্চে সবচেয়ে জনপ্রিয় নাটক। শচীন সেনগুপ্তের নাটক প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৩৮ সালে। নাটকে ইতিহাসের সত্যের সঙ্গে নাট্যকার নিপুণতার সঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছেন কল্পনার সত্যকে। এখানে নাট্যকার সিরাজ চরিত্রকে বাঙালি জাতির নায়করূপে নির্মাণ করেছেন।

সিকান্দার আবু জাফরের পরে সিরাজউদ্দৌলা বিষয়ে উল্লেখযোগ্য নাটক লিখেছেন সাঈদ আহমদ। সাঈদ আহমদের ‘শেষ নবাব’ প্রকাশিত হয় ১৯৮৯ সালে। নাটকের ভ‚মিকায় নাট্যকার লিখেছেন- ‘সিরাজউদ্দৌলাকে আমি নবরূপে উপস্থাপন করতে চেয়েছি। নতুন কিছু বলবারও চেষ্টা করেছি।’ আলোচ্য নাটকে সাঈদ আহমদ ১৭৫৭ সালে পলাশির যুদ্ধে নিহত সিরাজউদ্দৌলার পতনের মৌল কারণ তুলে ধরেছেন। ফলে ইতিহাসের অনেক তথ্য তিনি বাদ দিয়েছেন, ইতিহাস সন্ধান করে পরিবেশন করেছেন প্রকৃত সত্য। 

সাঈদ আহমদের ‘শেষ নবাব’ নাটক প্রসঙ্গে কবি শামসুর রাহমানের মন্তব্য এখানে প্রণিধানযোগ্য। তিনি লিখেছেন-“আরেকটি কথা। ‘শেষ নবাবে’র পান্ডুলিপি পড়তে পড়তে বারবার আমার মনে পড়েছে সমকালীন বাংলাদেশের কথা। আর সবকিছু ছাপিয়ে সিরাজদ্দৌলার অন্তরালে এক অতিকায় ছায়ার মতো জেগে রয়েছেন সেই মহানায়ক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যাঁর নাম। সৎ সাহিত্যের একটি গুণ এই যে, তা কোনো বিশেষ কালে সীমাবদ্ধ থাকে না।”

ওপরের আলোচনায় আপনি নিশ্চয়ই লক্ষ করেছেন সকল নাট্যকারেরই মৌল উদ্দেশ্য সিরাজ চরিত্রে আরোপিত কলঙ্কমোচন এবং তাঁর অতুল দেশপ্রেমের শিল্পরূপ নির্মাণ। এভাবে, বাঙালি নাট্যকারদের হাতে সিরাজউদ্দৌলা নতুন মহিমায় হলেন অভিষিক্ত।

সারসংক্ষেপ

গল্প, উপন্যাস, কবিতা, ছড়া, প্রবন্ধ, নাটক- সাহিত্যের এসব বিচিত্র শাখার মধ্যে নাটক এখন সবচেয়ে জনপ্রিয় শিল্পমাধ্যম। নাটক একই সঙ্গে দেখা ও শোনার বিষয়। মঞ্চে অভিনেতা অভিনেত্রীদের সাহায্যে মানবজীবনের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনা যখন সংলাপের আশ্রয়ে দর্শকের সামনে উপস্থাপন করা হয়, তখন তা হয় নাটক। নাটক হয়ে উঠতে হলে নাট্যকারকে কয়েকটি জরুরি বিষয় মেনে চলতে হয়। এই জরুরি বিষয়গুলোকে নাটকের শিল্পরীতি বলে।

শিল্পরীতির এই বিষয়গুলো হলো- কর্ম বা ক্রিয়ার গতিবেগ (action), সংঘাত (conflict) আকস্মিকতা (unexpectedness),, উৎকণ্ঠা (Suspense), নাট্যশ্লেষ  (dramatic irony) ইত্যাদি। এছাড়া, প্রতিটি নাটকের মধ্যে চারটি প্রধান উপাদান থাকে। এগুলো হচ্ছে- কাহিনি বা বিষয়, চরিত্র, সংলাপ এবংপরিবেশ। মনীষী এ্যারিস্টটলের মতে, তিনটি বিষয়ের ঐক্যই একটি নাটকের গঠনকৌশলের প্রধান ভিত্তি। এই ঐক্যত্রয় হলো- কালের ঐক্য, স্থানের ঐক্য ও ঘটনার ঐক্য। আবার একটি নাটকের গঠনকে প্রধানত পাঁচটি পর্বে বিভক্ত করা যায়। 

এই পর্বগুলো হলো- কাহিনির আরম্ভ-Exposition[মুখ],কাহিনির ক্রমব্যাপ্তি-  Rising action [প্রতিমুখ], উৎকর্ষ বা চূড়ান্ত দ্বন্দ- climax [গর্ভ], গ্রন্থিমোচন- Falling action  [বিমর্ষ], যবনিকাপাত-  Conclusion বা Catastrophe/ [উপসংহার]। এই পাঁচটি পর্যায়কে অবলম্বন করেই রচিত হয় পঞ্চাঙ্ক নাটক। নাটককে আমরা কতগুলো ভাগে বিভক্ত বা শ্রেণিবদ্ধ করতে পারি; আবার রসের বিচারে নাটককে ট্র্যাজেডি, কমেডি, ফার্স (প্রহসন) ইত্যাদি ভাগে বিন্যস্ত করতে পারি। বিভিন্ন ধরনের মাপকাঠির আলোকে নাটককে বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত করা সম্ভব।

খ্রিষ্টপূর্ব কাল থেকেই গ্রিস দেশে নাট্যচর্চার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের কথা জানা যায়। পেরিক্লিসের গ্রিসে এবং পরবর্তীকালে এলিজাবেথের ইংল্যান্ডে নাট্যচর্চায় ব্যাপক সমৃদ্ধি এসেছিল। প্রাচীন ভারতবর্ষেও সংস্কৃত নাটক খুব সমৃদ্ধ ছিল। বর্তমানে পৃথিবীর সব দেশেই নাট্যচর্চা আছে। বাংলা নাটকের ইতিহাস সুদীর্ঘ কালের। তবে আধুনিক অর্থে যাকে আমরা নাটক বলি, বাংলা ভাষায় তা প্রথম পাই আজ থেকে দুশো বছর আগে। ১৮৫২ সালে রচিত তারাচাঁদ শিকদারের ‘ভদ্রার্জ্জুন’কেই বাংলাভাষার প্রথম মৌলিক নাটক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। 

এরপর দীর্ঘ দেড়শত বছরে বাংলা নাটক নানাভাবে বিচিত্র মাত্রায় বিকশিত হয়েছে, রচিত হয়েছে উল্লেখযোগ্য বহু নাটক। বাংলা নাটকের এই বিকাশধারাকে আমরা বিভিন্নভাবে উপস্থাপন করতে পারি। যেমন সামাজিক নাটক, ঐতিহাসিক নাটক, পৌরাণিক নাটক, রূপক সাঙ্কেতিক নাটক, প্রহসন ও কৌতুক নাটক, গণনাট্যধারা, কাব্যনাটক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একক সাধনায় গড়ে উঠেছে বাংলা রূপক-সাঙ্কেতিক নাটকের ধারা। বিংশ শতাব্দীর চল্লিশের দশকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে বাংলা গণনাট্যধারার সূত্রপাত। সাধারণ মানুষকে প্রগতিশীল চেতনায় উদ্বুদ্ধ করাই ছিল এই ধরনের নাটক লেখার মৌল উদ্দেশ্য।

 বাংলা নাট্যসাহিত্যের ধারায় কাব্যনাটকের কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। দেশবিভাগের পরে বাংলাদেশে নাটক রচনায় একটা ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পর নাটক রচনা ও নাট্যচর্চায় ব্যাপক রূপান্তর সাধিত হয়। এ সময় গ্রæপ থিয়েটার আন্দোলনের কারণে বাংলাদেশের নাটকে লাগে পালা বদলের হাওয়া। সিকান্দার আবু জাফরের ‘সিরাজউদ্দৌলা’ নাটক প্রথম প্রকাশিত হয় ডিসেম্বর ১৯৬৫ সালে (পৌষ ১৩৭২)। ১৭৫৭ সালে পলাশির যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় ও পতনকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে আলোচ্য নাটক।

 ইতিহাসের ধূসর আবর্ত থেকে কাহিনির মৌল উপাদান গৃহীত হলেও, সিকান্দার আবু জাফর অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে আলোচ্য নাটকে বর্তমান কালের জীবন-জিজ্ঞাসাকে ইতিহাসের কাঠামোর মধ্যে প্রতিস্থাপন করেছেন। বাঙালির স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা আর সংগ্রামশীল সত্তা প্রকাশের আগ্রহ থেকেই নাট্যকারের সিরাজউদ্দৌলা স্মরণ। 

বহুনির্বাচনি প্রশ্ন 

১.‘ড্রামা’ শব্দটি কোন ভাষা থেকে এসেছে?

ক. ইংরেজি              খ. ল্যাটিন

গ. গ্রিক                    ঘ. ফরাসি

২. ট্র্যাজেডি দর্শকের চিত্তে

i. করুণা সঞ্চার করে

ii. ভয় সৃষ্টি করে

iii. প্রশান্তি আনয়ন করে

নিচের কোনটি সঠিক?

ক. i           খ. ii

গ. iii        ঘ. i, ii ও iii

নিচের উদ্দীপকটি পড়–ন এবং ৩ ও ৪ নং প্রশ্নের উত্তর দিন:

ইতিহাসের প্রতি সাহিত্যিকের আনুগত্য প্রদর্শন অপ্রয়োজনীয়। মূল কথা এই যে, ইতিহাসের মূল সত্যের প্রতি আস্থা রেখেই সাহিত্যিক ইতিহাস- অবলম্বী সাহিত্য রচনা করবেন; তবে ইতিহাসকে যান্ত্রিকভাবে অনুসরণের কোনো দায় লেখকের থাকবে না।

৩. উদ্দীপকের বিষয়বস্তু যে রচনার উপজীব্য-

ক. লালসালু                   খ. সিরাজউদ্দৌলা

গ. অপরিচিতা                ঘ. রেইনকোট

৪. উদ্দীপক ও নাটকের প্লট বিবেচনায় ‘সিরাজউদ্দৌলা’ একটি-

ক. ঐতিহাসিক নাটক                খ. সামাজিক নাটক

গ. ডিটেক্টিভ নাটক                   ঘ. রূপক নাটক 

বহুনির্বাচনি প্রশ্ন উত্তর

০১. গ ০২. ঘ ০৩. খ ০৪.ক

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনেট আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url