এইচ এস সি পদার্থবিজ্ঞান ২য় পত্র ১০ম অধ্যায়, সেমিকন্ডাকটর ও ইলেকট্রনিক্স

 সেমিকন্ডাকটর ও ইলেকট্রনিক্স


সূচীপত্র

ভূমিকা (Introduction)

বর্তমান যুগ হলো ইলেকট্রনিক্স এর যুগ। সেমিকন্ডাকটরকে ইলেকট্রনিক্স এর ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। রেডিও, টেলিভিশন, কম্পিউটার, রাডার, মোবাইল ফোন ইত্যাদি যন্ত্রপাতিতে ইলেক্ট্রনিক্স এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। এছাড়া, বাসা-বাড়ি, কল-কারখানা, অফিস-আদালত, ব্যাংক ও চিকিৎসাক্ষেত্রে ইলেকট্রনিক্স এর ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলছে। আধুনিক কম্পিউটার মানুষের জীবনের চলার পথকে সহকজতর করে তুলছে। 
যে কম্পিউটার আমাদেরকে ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করিয়েছে, তথ্যপ্রযুক্তির চরম উন্নতি সাধন করেছে সেটিও ইলেক্ট্রনিক্স এর অবদান। পদার্থবিজ্ঞানের যে শাখায় লো ভোল্টেজে, শূন্যস্থানে, গ্যাসে অথবা কঠিন মাধ্যমে ইলেকট্রনের গতি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়, তাকে ইলেকট্রনিক্স বলে। বিভিন্ন ধরনের সেমিকন্ডক্টার ও ট্রানজিন্টরের আবিষ্কারের ফলে ইলেকট্রনিক্স এর ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়েছে। এই অধ্যায়ে সেমিকন্ডাক্টার, ডায়োড, ট্রানজিস্টর ও এর ব্যবহার, লজিক গেট সম্পর্কে আলোচনা করা হবে।

পাঠ-১০.১ : পরিবাহী, অপরিবাহী ও অর্ধপরিবাহী
         (Conductor, Insulator and Semiconductor )

এই পাঠ শেষে তুমি-
  • পরিবাহী, অপরিবাহী ও অর্ধপরিবাহী ব্যাখ্যা করতে পারবে।
তড়িৎ পরিবাহিতা ধর্মের ওপর ভিত্তি করে কঠিন পদার্থকে তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত করা যায়। এগুলো হলো:
১. পরিবাহী
২. অপরিবাহী 
৩. অর্ধপরিবাহী।
১. পরিবাহী : যে সকল পদার্থের মধ্য দিয়ে সহজে তড়িৎ প্রবাহ চলতে পারে তাদেরকে পরিবাহী বলে।
সাধারণত ধাতব পদার্থ তড়িৎ সুপরিবাহী হয়। যেমন- তামা, রূপা, লোহা, অ্যালুমিনিয়াম ইত্যাদি পরিবাহী। পরিবাহীর আপেক্ষিক রোধ অনেক কম হয় প্রায়-10-8  Ωm ক্রমের। রূপা হলো সবচেয়ে উত্তম ধাতব পরিবাহক। পরিবাহীতে প্রচুর পরিমাণে মুক্ত ইলেকট্রন থাকে। ফলে পরিবাহীর দুই প্রান্তে সামান্য বিভব পার্থক্য প্রয়োগ করলেই মুক্ত ইলেকট্রনগুলো তড়িৎ প্রবাহের সৃষ্টি করে।
২. অপরিবাহী : যে সকল পদার্থের মধ্য দিয়ে তড়িৎপ্রবাহ চলতে পারে না তাদেরকে অন্তরক বা অপরিবাহী বলে। যেমন- কাচ, কাঠ, রাবার, প্লাস্টিক ইত্যাদি অপরিবাহী পদার্থ। অপরিবাহী পদার্থের তড়িৎ পরিবাহিতা খুব কম এবং আপেক্ষিক রোধের মান অত্যন্ত বেশি। অন্তরক পদার্থের আপেক্ষিক রোধ প্রায় 10- 12Ωm ক্রমের।
৩. অর্ধপরিবাহী : যে সকল পদার্থের তড়িৎ পরিবাহিতা অপরিবাহী ও পরিবাহীর মাঝামাঝি সেসব পদার্থকে অর্ধপরিবাহী বা সেমিকন্ডাক্টর বলে।

বহুনির্বাচনি প্রশ্ন

১। অর্ধপরিবাহীর ক্ষেত্রে কোনটি সত্য?
(ক) তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে রোধ বৃদ্ধি পায় (খ) প্রচুর মুক্ত ইলেকট্রন থাকে।
(গ) পরম শূন্য তাপমাত্রায় এরা অন্তরকের ন্যয় আচরণ করে। (ঘ) এদের পুরমানুর মধ্যে আয়নিক বন্ধন বিদ্যমান।
২। নিচের কোন পদার্থটি অর্ধপরিবাহী?
(ক) কাচ (খ) রূপা (গ) গেলিয়াম (ঘ) সিরামিক

পাঠ-১০.২ : ব্যান্ড তত্ত (Band Theory)

এই পাঠ শেষে তুমি-
  • কঠিন পদার্থের ব্যান্ড তত্ত¡ ব্যাখ্যা করতে পারবে।
  • ব্যান্ড তত্তে¡র সাহায্যে পরিবাহী, অপরিবাহী ও অর্ধপরিবাহী ব্যাখ্যা করতে পারবে।




১০.২.২ শক্তি ব্যান্ড Energy Band



সংজ্ঞাঃ কোনো কঠিন পদার্থের কেলাসে বিভিন্ন পরমাণুতে একই কক্ষপথে আবর্তনরত ইলেকট্রনগুলোর শক্তি যে সীমা বা  পালার মধ্যে অবস্থান করে তাকে শক্তি ব্যান্ড বলে।
পরমাণুর প্রথম কক্ষপথের ইলেকট্রন দ্বারা সৃষ্ট শক্তি হলো প্রথম শক্তি ব্যান্ড। অনুরূপভাবে দ্বিতীয় ও তৃতীয় কক্ষপথের  ইলেকট্রন দ্বারা সৃষ্ট শক্তি ব্যান্ডকে যথাক্রমে দ্বিতীয় শক্তি ব্যান্ড ও তৃতীয় শক্তি ব্যান্ড বলে। [চিত্র ১০.১]

(ক) যোজন ব্যান্ড (Valence Band) : পরমাণুর সবচেয়ে বাইরের কক্ষপথে অবস্থিত ইলেকট্রনকে যোজন ইলেকট্রন বলে। কঠিন বস্তুতে পরমাণুর যোজন ইলেকট্রনগুলোর শক্তির পালা বা ব্যান্ডকে যোজন ব্যান্ড বলে। [চিত্র১০.২]।
একটি সাধারণ পরমাণুর দূরতম কক্ষপথের যোজন ব্যান্ডের ইলেকট্রনের  শক্তি সবচেয়ে বেশি, কিন্তু এদের বন্ধনশক্তি সবচেয়ে কম। যোজন ব্যান্ড  কখনও ইলেকট্রন শূন্য থাকে না। এই ব্যান্ড পূর্ণ বা আংশিক পূর্ণ থাকতে  পারে। নিষ্ক্রিয় গ্যাসের ক্ষেত্রে যোজন ব্যান্ড পূর্ণ থাকে। ফলে এ গ্যাসগুলো  নতুন কোনো ইলেকট্রন গ্রহণ করতে পারে না। অন্যান্য পদার্থের ক্ষেত্রে  এই ব্যান্ড আংশিক পূর্ণ থাকে। আংশিক পূর্ণ যোজন ব্যান্ড আরো কিছু  সংখ্যক ইলেকট্রন গ্রহণ করতে পারে। যোজন ব্যান্ডের ইলেকট্রন তড়িৎ  পরিবহনে অংশগ্রহণ করে না, কিন্তু যোজন ব্যান্ডের হোল তড়িৎ পরিবহনে  অংশগ্রহণ করে। 

(খ) পরিবহন ব্যান্ড (Conduction Band) : কোনো কোনো পদার্থে বিশেষ করে ধাতব পদার্থের যোজন ইলেকট্রনগুলো  নিউক্লিয়াসের সাথে খুব শিথিলভাবে যুক্ত থাকে। এমনকি কক্ষ তাপমাত্রায় কিছু কিছু যোজন ইলেকট্রন নিউক্লিয়াসের  আকর্ষণ থেকে মুক্ত হয়ে মুক্ত ইলেকট্রনে পরিণত হয়। প্রকৃতপক্ষে এই সকল মুক্ত ইলেকট্রন পরিবাহীতে তড়িৎ পরিবহনে  ভূমিকা রাখে।
পরমাণুতে অবস্থিত মুক্ত যোজন ইলেকট্রন তড়িৎ পরিবহনে অংশ গ্রহণ করে বলে এদেরকে পরিবহন ইলেকট্রন বলে।  পরিবহন ইলেকট্রনগুলোর শক্তির পাল্লা বা ব্যান্ডকে পরিবহন ব্যান্ড বলে [চিত্র ১০.২]।
পরিবহন ব্যান্ডের সকল ইলেকট্রন মুক্ত ইলেকট্রন। পরিবহন ব্যান্ড সম্পূর্ণ ইলেকট্রন শূন্য অথবা আংশিক পূর্ণ থাকতে  পারে। যদি কোনো পদার্থের পরিবহন ব্যান্ড সম্পূর্ণ ফাঁকা থাকে, তাহলে ঐ পদার্থে তড়িৎ পরিবহন সম্ভব নয়। ঐ জাতীয়  পদার্থকে অন্তরক বলে। সাধারণত, অন্তরক পদার্থের পরিবহন ব্যান্ড সম্পূর্ণ ফাঁকা থাকে এবং পরিবাহীর পরিবহন ব্যান্ড  আংশিক পূর্ণ থাকে। পরিবহন ব্যান্ডের অবস্থান যোজন ব্যান্ডের উপরে থাকার কারণে পরিবহন ব্যান্ডের ইলেকট্রনের শক্তি  যোজন ব্যান্ডের ইলেকট্রনের শক্তির চেয়ে বেশি থাকে।

(গ) নিষিদ্ধ শক্তি ব্যান্ড  (Forbidden Enegry gap): সাধারণত যোজন ব্যান্ড ও পরিবহন ব্যান্ডের মধ্যে ইলেকট্রনের  কোনো শক্তি স্তর বিদ্যমান থাকে না । এজন্য এ স্থানকে নিষিদ্ধ ব্যান্ড (Forbidden band) বলে ।

১০.২.৩ ব্যান্ড তত্তের আলোকে পরিবাহী, অর্ধপরিবাহী ও অন্তরক (Conductor, Semiconductor & Insulator in terms of Band Theory)

আমরা জানি, কিছু কিছু কঠিন পদার্থের মধ্য দিয়ে সহজে বিদ্যুৎ চলাচল করতে পারে। এগুলো সুপরিবাহক পদার্থ। আবার  এমন কিছু পদার্থ আছে যেগুলোর মধ্য দিয়ে আদৌ তড়িৎ প্রবাহিত হয় না। এদেরকে অন্তরক পদার্থ বলে। এদের  মাঝামাঝি শ্রেণির কিছু পদার্থ আছে যেগুলোকে অর্ধপরিবাহী বলে। তড়িৎ পরিবাহিতা ধর্মের উপর ভিত্তি করে কঠিন পদার্থের  প্রকৃতিগত এই পার্থক্য শক্তি ব্যান্ডের সাহায্যে খুব সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করা যায়।
পরিবাহী : যে সব পদার্থের মধ্যে যথেষ্ট মুক্ত ইলেকট্রন থাকে এবং যেগুলোর মধ্য দিয়ে খুব সহজে তড়িৎ প্রবাহ চলাচল  করতে পারে সে সব পদার্থকে পরিবাহী বলে। যেমন : তামা, অ্যালুমিনিয়াম, রূপা, লোহা ইত্যাদি পরিবাহী।



অন্তরক বা অপরিবাহী : যে সকল পদার্থের মধ্য দিয়ে তড়িৎ প্রবাহ চলতে পারে না তাদেরকে অপরিবাহী বা অন্তরক বলে।


অর্ধপরিবাহী : অর্ধপরিবাহী হলো সেই সব পদার্থ, যাদের তড়িৎ পরিবাহিতা পরিবাহী এবং অন্তরক পদার্থের মাঝামাঝি।  অর্ধপরিবাহী পদার্থের শক্তি ব্যান্ড কাঠামো অন্তরক পদার্থের অনুরূপ। কিন্তু অর্ধপরিবাহী পদার্থের নিষিদ্ধ শক্তি ব্যবধানের  মান অন্তরক পদার্থের তুলনায় অনেক কম। 

সারসংক্ষেপ :

শক্তি স্তর : পরমাণুর ইলেকট্রন যে কক্ষপথে আবর্তন করে সেই কক্ষপথের শক্তি ধারণ করে। ইলেকট্রনের ক্ষপথগুলোর  শক্তিকে কতকগুলো সুনির্দিষ্ট শক্তি স্তর হিসেবে প্রকাশ করা হয়। এই স্তরগুলোকে ইলেকট্রনের শক্তি স্তর বলে।
শক্তি ব্যান্ড : কোনো কঠিন পদার্থের কেলাসে বিভিন্ন পরমাণুতে একই কক্ষপথে আবর্তনরত ইলেকট্রনগুলোর শক্তি যে  সীমা বা পালার মধ্যে অবস্থান করে তাকে শক্তি ব্যান্ড বলে।
যোজন ব্যান্ড : পরমাণুর সবচেয়ে বাইরের কক্ষপথে অবস্থিত ইলেকট্রনকে যোজন ইলেকট্রন বলে। কঠিন বস্তুতে  পরমাণুর যোজন ইলেকট্রনগুলোর শক্তির পাল্লা বা ব্যান্ডকে যোজন ব্যান্ড বলে।
পরিবহন ব্যান্ড: পরমাণুতে অবস্থিত মুক্ত যোজন ইলেকট্রন তড়িৎ পরিবহনে অংশ গ্রহণ করে বলে এদেরকে পরিবহন  ইলেকট্রন বলে। পরিবহন ইলেকট্রনগুলোর শক্তির পাল্লা বা ব্যান্ডকে পরিবহন ব্যান্ড বলে।
নিষিদ্ধ শক্তি ব্যান্ড : সাধারণত যোজন ব্যান্ড ও পরিবহন ব্যান্ডের মধ্যে ইলেকট্রনের কোনো শক্তি স্তর বিদ্যমান থাকে  না। এজন্য এ স্থানকে নিষিদ্ধ ব্যান্ড  (Forbidden band) বলে ।

বহুনির্বাচনি প্রশ্ন

১। অর্ধপরিবাহীর যোজন ব্যান্ড ও পরিবাহন ব্যান্ডের মধ্যে শক্তির পার্থক্য প্রায় -
(ক)1 eV (খ) 15 eV (গ) 25 eV (ঘ) 50 eV
২। নিচের কোনটি সত্য?
(ক) পরিবাহীর পারিবহন ব্যান্ড সম্পূর্ণ ফাঁকা থাকে 
(খ) অপরিবাহীর পরিবহন ব্যান্ড পূর্ণ থাকে
(গ) অর্ধপরিবাহীর পরিবহন ব্যান্ড আংশিক পূর্ণ থাকে 
(ঘ) অর্ধ পরিবাহীর যোজন ব্যান্ড ও পরিবহন ব্যান্ডের মধ্যে উপরিপাতন ঘটে

পাঠ-১০.৩ : আধান বাহক : ইলেকট্রন ও হোলের ধারণা
                 (Charge Carrier: Concept of Electron & Hole)






মুক্ত ইলেকট্রন : কোনো কোনো পদার্থে, বিশেষ করে ধাতব পদার্থে যোজন ইলেকট্রনগুলির শক্তি এত বেশি থাকে যে, এগুলো নিউক্লিয়াসের সাথে খুব হালকাভাবে আবদ্ধ থাকে। হালকাভাবে আবদ্ধ এই যোজন ইলেকট্রনগুলো পদার্থের মধ্যে  বিক্ষিপ্তভাবে ঘুরে বেড়ায়। এগুলোকে মুক্ত ইলেকট্রন বলে। যোজন ইলেকট্রনগুলোর মধ্যে যেগুলো অত্যন্ত হালকাভাবে  নিউক্লিয়াসের সাথে আবদ্ধ থাকে সেগুলোকে মুক্ত ইলেকট্রন বলে।

বাইরে থেকে সামান্য পরিমাণ শক্তি সরবরাহ করা হলে মুক্ত ইলেকট্রনগুলো সহজেই চলাচল করতে পারে। এই মুক্ত  ইলেকট্রন গুলোই কোনো পদার্থের তড়িৎ পরিবাহিতা ধর্ম নির্ধারণ করে। পরিবাহীতে প্রচুর পরিমাণে মুক্ত ইলেকট্রন থাকে।  সাধারণ তাপমাত্রায় অন্তরক পদার্থে কোনো মুক্ত ইলেকট্রন থাকে না। অর্ধ পরিবাহীতে কক্ষ তাপমাত্রায় খুবই স্বল্প সংখ্যক  মুক্ত ইলেকট্রন থাকে।

হোল (Hole) : জার্মেনিয়াম, সিলিকন প্রভৃতি অর্ধপরিবাহী পদার্থের পরমাণুর বাইরের কক্ষপথে ৪ টি যোজন ইলেকট্রন থাকার ফলে এগুলো প্রতিবেশী পরমাণুর ইলেকট্রনের সাথে ইলেকট্রন ভাগাভাগি করে বাইরের কক্ষপথে অষ্টক পূর্ণ করে  অর্থাৎ সমযোজী বন্ধন  (Covalent Band) গঠন করে। ফলশ্রতিতে বিশুদ্ধ জার্মেনিয়াম বা সিলিকনে কোনো স্বাধীন বা  মুক্ত ইলেকট্রন থাকে না। তাই নিম্ন তাপমাত্রায় তাদের কোনো পরিবহন ক্ষমতা থাকে না। 

কক্ষ তাপমাত্রায় বা একটু বেশি তাপমাত্রায় বিশুদ্ধ অর্ধপরিবাহীর কিছু সংখ্যক সমযোজী বন্ধন ভেঙ্গে যায় এবং মুক্ত  ইলেকট্রনের সৃষ্টি হয়। বিভব পার্থক্য বা তড়িৎক্ষেত্রের প্রভাবে এই মুক্ত ইলেকট্রনগুলো তড়িৎ প্রবাহের সৃষ্টি করে। একই  সময়ে অন্য একটি প্রবাহ যাকে হোল প্রবাহ বলে, ইলেকট্রনের গতির বিপরীত দিকে সৃষ্টি হয়। 
তাপীয় শক্তির জন্য ইলেকট্রন যখন কোনো সমযোজী বন্ধন ভেঙ্গে বের হয়ে আসে তখন ইলেকট্রনের এই অপসারণ  সমযোজী বন্ধনে একটি শূন্য স্থান রেখে আসে। ইলেকট্রনের এই শূন্যতা বা অনুপস্থিতিকে হোল বলা হয়, যেটি ধনাত্মক  আধান হিসেবে কাজ করে।



প্রবাহের সৃষ্টি হয়। এখানে মনে রাখতে হবে যে হোল প্রবাহের সৃষ্টি হয় এক সমযোজী বন্ধন থেকে অন্য সমযোজী বন্ধনে  যোজন ইলেকট্রনের গতির ফলে।


সারসংক্ষেপ :

পরমাণু : সকল পদার্থই অতি ক্ষুদ্র কণিকা দ্বারা গঠিত। এদেরকে পরমাণু বলে। 
মুক্ত ইলেকট্রন : কোনো কোনো পদার্থে, বিশেষ করে ধাতব পদার্থে যোজন ইলেকট্রনগুলির শক্তি এত বেশি থাকে যে,  এগুলো নিউক্লিয়াসের সাথে খুব হালকাভাবে আবদ্ধ থাকে। হালকাভাবে আবদ্ধ এই যোজন ইলেকট্রনগুলো পদার্থের  মধ্যে বিক্ষিপ্তভাবে ঘুরে বেড়ায়। এগুলোকে মুক্ত ইলেকট্রন বলে।

হোল : তাপীয় শক্তির জন্য ইলেকট্রন যখন কোনো সমযোজী বন্ধন ভেঙ্গে বের হয়ে আসে তখন ইলেকট্রনের এই  অপসারণ সমযোজী বন্ধনে একটি শূন্য স্থান রেখে আসে। ইলেকট্রনের এই শূন্যতা বা অনুপস্থিতিকে হোল বলা হয়,  যেটি ধনাত্মক আধান হিসেবে কাজ করে।

বহুনির্বাচনি প্রশ্ন

১। একটি অর্ধ পরিবাহী পদার্থে তড়িৎ পরিবাহিতার জন্য দায়ী কোনটি?
(ক) হোল
(খ) মুক্ত ইলেকট্রন
(গ) মুক্ত ইলেকট্রন ও হোল
(গ) মুক্ত ইলেকট্রন ও প্রোটন

২। একটি বিশুদ্ধজাত অর্ধপরিবাহীতে কক্ষ তাপমাত্রায় কিছু হোল আছে। হোল সৃষ্টির কারণ-
(ক) ডোপিং
(খ) মুক্ত ইলেকট্রন 
(গ) তাপীয় শক্তি
(ঘ) যোজন ইলেকট্রন

পাঠ-১০.৪ : অর্ধপরিবাহী প্রকারভেদ

এ পাঠশেষে তুমি-
  • অন্তর্জাত ও বহির্জাত অর্ধপরিবাহী ব্যাখ্যা করতে পারবে।
  • p- টাইপ ও n- টাইপ অর্ধপরিবাহী ব্যাখ্যা করতে পারবে।

১০.৪.১ অন্তর্জাত ও বহির্জাত অর্ধপরিবাহী’(Intrinsic and Extrinsic Semiconductor)

অর্ধপরিবাহী বা সেমিকন্ডাক্টর পদার্থকে দুভাবে বিভক্ত করা হয়। এগুলো হলো -
১। বিশুদ্ধ বা অন্তর্জাত অর্ধপরিবাহী (Pure or Intrinsic Semiconducter)
২। অবিশুদ্ধ বা বহির্জাত পরিবাহী (Impure or Extrinsic Semiconducter)

১। বিশুদ্ধ বা অন্তর্জাত অর্ধপরিবাহী ঃ যে সব অর্ধপরিবাহীতে কোনো অপদ্রব্য (Impurity) থাকে বা মেশানো হয় না  তাদেরকে বিশুদ্ধ বা অন্তর্জাত অর্ধপরিবাহী বলে।
উদাহরণঃ যে সব পদার্থের পরমাণুর সর্ববহিঃস্থ কক্ষে সর্বোচ্চ ৮টি ইলেকট্রনের স্থানে ৪টি যোজন ইলেকট্রন বিদ্যামান থাকে  এবং যেগুলো পর্যায় সারণির চতুর্থ গ্র“পের সদস্য সেগুলো বিশুদ্ধ অর্ধপরিবাহীর অন্তভর্‚ক্ত। যেমন -সিলিকন,  জার্মেনিয়াম, টিন ইত্যাদি বিশুদ্ধ অর্ধপরিবাহী।

 বিশুদ্ধ অর্ধপরিবাহীতে কক্ষ তাপমাত্রায় হোল-ইলেকট্রন জোড়ের সৃষ্টি হয়।  ফলে এদের পরিবহন ব্যান্ডের ইলেকট্রন সংখ্যা এবং যোজন ব্যান্ডের হোলের সংখ্যা সমান হয়। বিশুদ্ধ অর্ধপরিবাহীতে মুক্ত ইলেকট্রনের এবং হোলের সংখ্যা খুব কম হওয়াতে এদের তড়িৎ পরিবাহিতা খুব কম হয় এবং বাস্তবে কোনো কাজে  লাগানো যায় না।
২। অবিশুদ্ধ বা বহির্জাত পরিবাহী ঃ বিশুদ্ধ অর্ধপরিবাহীর সাথে খুব সামান্য পরিমাণে (এক কোটি পরমাণুতে একটি  পরমাণু) যথোপযুক্ত অপদ্রব্য মেশালে যে অর্ধপরিবাহীর সৃষ্টি হয় তাকে অবিশুদ্ধ বা দূষিত বা বহির্জাত অর্ধপরিবাহী বলে। 
বিশুদ্ধ অর্ধপরিবাহীর সাথে অপদ্রব্য মেশানোর ফলে এগুলোতে বিপুল পরিমাণ মুক্ত ইলেকট্রন বা মুক্ত হোলের সৃষ্টি হয়, ফলে সিলিকন বা জার্মেনিয়াম কেলাসের পরিবাহিতা অনেক গুণে বৃদ্ধি পায়। অপদ্রব্যযুক্ত এই অর্ধপরিবাহীকে বহির্জাত  অর্ধপরিবাহী বলে। বিশুদ্ধ জার্মেনিয়াম, সিলিকন অর্ধপরিবাহীর সাথে বোরন, এ্যালুমিনিয়াম, ফসফরাস, আর্সেনিক ইত্যাদি  অপদ্রব্য মিশিয়ে বহির্জাত অর্ধপরিবাহী তৈরি করা হয়।

ডোপিং (Doping) ঃ বহির্জাত অর্ধপরিবাহী তৈরির জন্য বিশুদ্ধ অর্ধপরিবাহীর সাথে সুনিয়ন্ত্রিত ও উপযুক্ত উপায়ে সামান্য  পরিমাণ অপদ্রব্য মিশানোর প্রক্রিয়াকে ডোপিং বলে।
ডোপিং এর ফলে অর্ধপরিবাহীর তড়িৎ পরিবাহিতা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
ডোপিং এর জন্য দুই ধরনের অপদ্রব্য ব্যবহার করা হয়। যথা -
(ক) পর্যায় সারণির তৃতীয় সারির মৌল, যেমন -বোরন, অ্যালুমিনিয়াম, গ্যালিয়াম ইত্যাদি।
(খ) পর্যায় সারণির পঞ্চম সারির মৌল, যেমন - ফসফরাস, আর্সেনিক, এন্টিমনি ইত্যাদি।
১০.৪.২  p - টাইপ এবং n- টাইপ অর্ধপরিবাহী
                                                                       p- type and n- type semiconducter
বিশুদ্ধ অর্ধপরিবাহীর সাথে কোনো ধরনের অপদ্রব্য মিশানো হয় তার উপর ভিত্তি করে বহির্জাত অর্ধপরিবাহীকে দু’ভাগে  বিভক্ত করা হয়।

১। p- টাইপ অর্ধপরিবাহী।
২। n-টাইপ অর্ধপরিবাহী।
১। p- টাইপ অর্ধপরিবাহী ঃ কোনো বিশুদ্ধ অর্ধপরিবাহীর সাথে সামান্য পরিমাণ ত্রিযোজী মৌল অপদ্রব্য হিসেবে মেশানো  হলে, তাকে p- টাইপ অর্ধপরিবাহী বলে।
বিশুদ্ধ অর্ধপরিবাহীর সাথে অপদ্রব্যকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় উচ্চতাপে  মেশানো হয়। অপদ্রব্যের পরিমাণ এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয় যেন এর পরমাণুগুলো মূল অর্ধপরিবাহী কেলাসের গঠন কাঠামোর কোনো 
পরিবর্তন না ঘটিয়ে কেলাস ল্যাটিসে অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ে। আমরা জানি, জার্মেনিয়াম বা সিলিকনের পরমাণুতে চারটি করে যোজন ইলেকট্রন রয়েছে।

 অপরদিকে অ্যালুমিনিয়াম পরমাণুতে তিনটি যোজন ইলেকট্রন আছে। বিশুদ্ধ জার্মেনিয়ামের সাথে যদি উপযুক্ত মাত্রায় (দশ লক্ষে একটি) অ্যালুমিনিয়ামের মতো ত্রিযোজী মৌল মেশানো হয়, তা হলো ঐ কেলাসের গঠনের কোনো পরিবর্তন হয় না, কিন্তু পার্শ্ববর্তী  চতুর্যোজী অর্ধপরিবাহীর সাথে সমযোজী বন্ধন গঠন করতে এর একটি  ইলেকট্রনের ঘাটতি পড়ে। ফলে ঐ স্থানে বন্ধন তৈরি হয় না। এই ইলেকট্রন ঘাটতি মানেই ‘হোল’ সৃষ্টি হয়। প্রতিটি al পরমাণু একটি করে হোল সৃষ্টি করে [চিত্র : ১০.৮]। 

এ হোলগুলো  ইলেকট্রন গ্রহণ করতে প্রস্তুত থাকে। এ জন্য অ্যালুমিনিয়াম পরমানুকে ‘গ্রাহক’ পরমাণু বলে। এভাবে প্রতিটি  অ্যালুমিনিয়াম পরমাণু একটি করে হোল সৃষ্টি করে। এভাবে খুব সামান্য পরিমাণ অ্যালুমিনিয়াম লক্ষ লক্ষ হোল সৃষ্টি করে।  অ্যালুমিনিয়াম পরমাণুর ধনাত্মক হোল Ge - Ge বন্ধন থেকে একটি ইলেকট্রন গ্রহণ করলে যে পরমাণু থেকে এটি আসে  সেখানে একটি হোলের সৃষ্টি হয়। সেই হোলকে পূর্ণ করার জন্য অন্য একটি ইলেকট্রন চলে আসে। 

এভাবে এ প্রক্রিয়া  চলতেই থাকে। ফলে মনে হয়, ধনাত্মক হোল পদার্থের মধ্য দিয়ে ইলেকট্রনের গতির বিপরীত দিকে গতিশীল হয়। এছাড়া  কক্ষ তাপমাত্রায় তাপীয় শক্তির প্রভাবে কিছু সমযোজী বন্ধন ভেঙ্গে যায় এবং পরিবহন ব্যান্ডে খুব সামান্য পরিমাণ ইলেকট্রন বিদ্যমান থাকে। এখানে গরিষ্ঠ আধান বাহক হলো হোল এবং লঘিষ্ঠ আধান বাহক হলো ইলেকট্রন। এখানে  হোল অর্থাৎ ধনাত্মক চার্জের গতির ফলেই তড়িৎ প্রবাহের সৃষ্টি হয়। এ কারণে এ ধরনের অর্ধপরিবাহীকে p- টাইপ  অর্ধপরিবাহী বলে।


২। n-টাইপ অর্ধপরিবাহী : কোনো বিশুদ্ধ অর্ধপরিবাহীর সাথে সামান্য পরিমাণ পঞ্চযোজী মৌল অপদ্রব্য হিসেবে মেশানো  হলে তাকে n-টাইপ অর্ধপরিবাহী বলে।
কিভাবে n-টাইপ অর্ধপরিবাহী তৈরি করা হয় তা ব্যাখ্যা করার জন্য  একটি বিশুদ্ধ জার্মেনিয়ামের কেলাস বিবেচনা করি। আমরা জানি  জ্যার্মেনিয়ামে পরমাণুতে চারটি যোজন ইলেকট্রন থাকে। অপরদিকে  অপদ্রব্য পরমাণু আর্সেনিকের পাঁচটি যোজন ইলেকট্রন আছে। বিশুদ্ধ  জার্মেনিয়ামের সাথে যদি উপযুক্ত মাত্রায় (দশ লক্ষে একটি) আর্সেনিকের  মতো কোনো পঞ্চযোজী মৌল মেশানো হয়, তাহলে ঐ কেলাসের গঠনের  কোনো পরিবর্তন হয় না, কিন্তু মিশ্রিত পরমাণুর পাঁচটি যোজন 
ইলেকট্রনের মধ্যে চারটি জার্মেনিয়াম পরমাণুর সাথে সমযোজী বন্ধন গঠন  করে এবং একটি ইলেকট্রন উদ্বৃত্ত থাকে । [চিত্র ১০. ৯ ]। 

এই উদ্বৃত্ত ইলেকট্রনকে খুব সামান্য শক্তি সরবরাহ করে মুক্ত করা যায় এবং এগুলোই অর্ধপরিবাহীর তড়িৎ পরিবাহিতা বৃদ্ধি  করে। প্রতিটি অপদ্রব্য পরমাণু (AS) কেলাসে একটি করে ইলেকট্রন দান করে। তড়িৎ পরিবহনের জন্য অপদ্রব্য  পরমাণুগুলো ইলেকট্রন দান করে বলে এদেরকে ‘দাতা’ পরমাণু বলে। এভাবে খুব সামান্য পরিমাণ আর্সেনিক অপদ্রব্য লক্ষ লক্ষ মুক্ত ইলেকট্রন সৃষ্টি করে। 

এ ধরনের অর্ধপরিবাহীতে ইলেকট্রন অর্থাৎ ঋণাত্মক চার্জের গতির ফলেই প্রধানত তড়িৎ  প্রবাহের সৃষ্টি হয় বলে এদেরকে n-টাইপ অর্ধপরিবাহী বলে। এছাড়া কক্ষ তাপমাত্রায় তাপীয় শক্তির প্রভাবে খুব সামান্য পরিমাণ হোল-ইলেকট্রন জোড়া সৃষ্টি হয়। তথাপি পঞ্চযোজী  মৌল কর্তৃক সরবরাহকৃত মুক্ত ইলেকট্রনের সংখ্যা সৃষ্ট হোলের সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি থাকে। এ কারণে n-টাইপ  অর্ধপরিবাহীতে গরিষ্ঠ আধান বাহক হলো ইলেকট্রন এবং লঘিষ্ঠ আধান বাহক হলো হোল।




সারসংক্ষেপ :

অন্তর্জাত অর্ধপরিবাহী : যে সব অর্ধপরিবাহীতে কোনো অপদ্রব্য থাকে না মেশানো হয় না তাদেরকে বিশুদ্ধ বা অন্ত র্জাত অর্ধপরিবাহী বলে।
বহির্জাত পরিবাহী : বিশুদ্ধ অর্ধপরিবাহীর সাথে খুব সামান্য পরিমাণে (এক কোটি পরমাণুতে একটি পরমাণু) যথোপযুক্ত  অপদ্রব্য মেশালে যে অর্ধপরিবাহীর সৃষ্টি হয় তাকে অবিশুদ্ধ বা দূষিত বা বহির্জাত অর্ধপরিবাহী বলে।
ডোপিং : বহির্জাত অর্ধপরিবাহী তৈরির জন্য বিশুদ্ধ অর্ধপরিবাহীর সাথে সুনিয়ন্ত্রিত ও উপযুক্ত উপায়ে সামান্য পরিমাণ  অপদ্রব্য মিশানোর প্রক্রিয়াকে ডোপিং বলে। 
p- টাইপ অর্ধপরিবাহী :কোনো বিশুদ্ধ অর্ধপরিবাহীর সাথে সামান্য পরিমাণ ত্রিযোজী মৌল অপদ্রব্য হিসেবে মেশানো  হলে, তাকে p- টাইপ অর্ধপরিবাহী বলে।
n-টাইপ অর্ধপরিবাহী : কোনো বিশুদ্ধ অর্ধপরিবাহীর সাথে সামান্য পরিমাণ পঞ্চযোজী মৌল অপদ্রব্য হিসেবে মেশানো  হলে তাকে n-টাইপ অর্ধপরিবাহী বলে।

বহুনির্বাচনি প্রশ্ন

১। p-টাইপ জার্মেনিয়াম অর্ধপরিবাহী তৈরির জন্য নিচের কোনটি দিয়ে ডোপিং করতে হবে?
(ক) আর্সেনিক 
(খ) এন্টিমনি
(গ) অ্যালুমিনিয়াম
(ঘ) ফসফরাস
২। যখন বিশুদ্ধ সিলিকন অর্ধপরিবাহীতে অপদ্রব্য হিসেবে আর্সেনিক ডোপিং করা হয় তখন যা তৈরি হবে-
(ক) n-টাইপ অর্ধপরিবাহী
(খ) p-টাইপ অর্ধপরিবাহী
(গ) n-টাইপ পরিবাহী
(ঘ) কোনটিই না 

পাঠ-১০.৫ : ডায়োড : p-n জাংশনের বৈশিষ্ট্য লেখ
         ( Diode : Characteristic Curve of a p-n Junction) 

 এ পাঠশেষে তুমি-
  • অর্ধপরিবাহী ডায়োড ব্যাখ্যা করতে পারবে।
  •  p-n জাংশনের বৈশিষ্ট্য লেখচিত্র অংকন ও ব্যাখ্যা করতে পারবে ।
১০.৫.১ অর্ধপরিবাহী ডায়োড বা জাংশন ডায়োড
                                                     (Semiconductor Diode or Junction Diode)

জাংশান ডায়োড : একটি p-টাইপ অর্ধপরিবাহী ও একটি n-টাইপ অর্ধপরিবাহীকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় 
পরস্পরের সাথে সংযুক্ত করা হলে সংযোগ পৃষ্ঠকে তথা সৃষ্ট ব্যবস্থাকে p-n জাংশন বা জাংশন ডায়োড বলে।  দুটি অর্ধপরিবাহী সমন্বয়ে গঠিত বলে একে অর্ধপরিবাহী ডায়োডও বলে [চিত্র ১০.১০ (ক) ]। 
প্রকৃতপক্ষে দুটি অর্ধপরিবাহীকে জোড়া লাগিয়ে ডায়োড তৈরি করা হয় না। বাস্তবে একটি বিশুদ্ধ অর্ধপরিবাহী কেলাসের  এক অর্ধাংশে ত্রিযোজী অপদ্রব্য এবং অপর অর্ধাংশে পঞ্চযোজী অপদ্রব্য বিশেষ প্রক্রিয়ায় মিশিয়ে p-n জাংশন তৈরি করা  হয়।

আমরা জানি, একটি p-টাইপ অর্ধপরিবাহীর অভ্যন্তরে বহুসংখ্যক হোল ও অতি অল্প সংখ্যক ইলেকট্রন থাকে। একইভাবে একটি n-টাইপ অর্ধপরিবাহীতে বহুসংখ্যক মুক্ত ইলেকট্রন এবং অতি অল্পসংখ্যক হোল বর্তমান থাকে। p-n জাংশন তৈরির সাথে সাথে p-অঞ্চলের হোলের সংখ্যা হ-অঞ্চলের হোলের সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি বলে ব্যাপনের নিয়ম অনুযায়ী p-অঞ্চলের হোলগুলো n-অঞ্চলে যেতে চেষ্টা করে যাতে p ও হ অঞ্চলের সর্বত্র হোলের ঘনত্ব সমান হয়। অনুরূপভাবে হঅঞ্চল থেকে কিছু ইলেকট্রন p-অঞ্চলে যেতে চেষ্টা করে। অর্থাৎ ডায়োডের জাংশনে মুক্ত হোল এবং মুক্ত ইলেকট্রন উভয়েই ব্যাপন ক্রিয়ার মাধ্যমে সংযোগস্থলকে অতিক্রম করতে  চায়।
অর্ধপরিবাহী ডায়োডের বায়াসিং
                                           (Biasing of Semiconductor Diode )
একটি p-n জাংশনে বাহ্যিক ভোল্টেজ বা বিভব পার্থক্য প্রয়োগ করা হলে তড়িৎ প্রবাহের সৃষ্টি হয়। এটি নির্ভর করে p-n জাংশনে বিভব পার্থক্য কীভাবে প্রয়োগ করা হয়, তার ওপর। একটি p-n জাংশনকে দুই ভাবে বায়াসিং বা ঝোঁক প্রদান  করা যায়। এগুলো হলো-
১। সম্মুখী ঝোঁক (Forward Bias) 
২। বিমুখী ঝোঁক  (Reverse Bias)


১০.৫.২ p-n জাংশনের বৈশিষ্ট্য লেখ
         (Characteristic Curve of a p-n Junction)

একটি p-n জাংশনের দুইপ্রান্তে ভোল্টেজ বা বিভব পার্থক্য প্রয়োগ করলে এর মধ্য দিয়ে তড়িৎ প্রবাহ পাওয়া যায়। ভোল্টেজ পরিবর্তনের সাথে এর তড়িৎপ্রবাহের যে পরিবর্তন ঘটে তা লেখচিত্রের মাধ্যমে উপস্থাপন করা যায়। V বনাম I লেখকে p-n জাংশনের বা অর্ধপরিবাহী ডাযোডের বৈশিষ্ট্য লেখ বা V-I লেখচিত্র বলা হয়।

একটি p-n জাংশনের বৈশিষ্ট্য লেখ অঙ্কন করার জন্য সম্মুখী ঝোঁকের ক্ষেত্রে ১০.১৩ক চিত্রের ন্যায় একটি বর্তনী ব্যবহার  করা হয়। বর্তনীতে রয়েছে একটি জাংশন ডায়োড, তড়িৎপ্রবাহ মাপার জন্য একটি মিলি আমিটার বিভব পার্থক্য মাপার  জন্য একটি ভোল্টমিটার, একটি ব্যাটারি চাবি ইত্যাদি। পরিবর্তনশীল রোধ Rh এর মাধ্যমে জাংশনের দুই প্রান্তের  বায়াসিং ভোল্টেজ এর মান হ্রাস-বৃদ্ধি করা হয়। প্রযুক্ত ভোল্টেজ (V) কে X-অক্ষের দিকে এবং তড়িৎ প্রবাহমাত্রা (X) কে  Y-অক্ষ বরাবর স্থাপন করলে চিত্র ১০.১৩(গ)-এর ন্যায় লেখচিত্র পাওয়া যাবে।






সারসংক্ষেপ :


বহুনির্বাচনি প্রশ্ন

১। p-n জাংশনের সংযোগস্থলে ডিপ্লেশন স্তর সৃষ্টির কারণ-
(ক) আধান বাহকের ব্যাপন (খ) ইলেকট্রনের তাড়ন (Drift)
(গ) হোলের তাড়ন (ঘ) অপদ্রব্য আয়নের স্থানন্তর

২। সিলিকন ডায়োডের ক্ষেত্রে নী (Knee) ভোন্টেজ হলো-
(ক) 0.2 V (খ) 0.7 V (গ) 0.8 V (ঘ) 1.0 V

পাঠ-১০.৬ : একমুখীকরণ : পূর্ণ তরঙ্গ ব্রিজ রেকটিফায়ার
        (Rectification : Full Wave Bridge Rectifier)

এ পাঠ শেষে তুমি-
  • একমুখিকরণ ব্যাখ্যা করতে পারবে।
  • অর্ধতরঙ্গ রেকটিফিকেশন বর্তনী ও কার্যপ্রণালী ব্যাখ্যা করতে পারবে।
  • পূর্ণ তরঙ্গ রেকটিফায়ার বর্তনী ও কার্যপ্রণালী ব্যাখ্যা করতে পারবে।
  • পূর্ণ তরঙ্গ রেকটিফায়ার বর্তনী ও কার্যপ্রণালী ব্যাখ্যা করতে পারবে।
  • পূর্ণ তরঙ্গ ব্রিজ রেকটিফায়ারের গঠন ও কার্যপদ্ধতি ব্যাখ্যা করতে পারবে।

১০.৬.১ : একমুখীকরণ  (Rectification)

তড়িৎশক্তি সাধারণত এসি (AC) সরবরাহ হিসেবে উৎপাদন ও বিতরণ করা হয়। বিদ্যুৎ কেন্দ্র কর্তৃক 
সরবরাহকৃত ভোল্টেজ সাইন তরঙ্গ আকারে পরিবর্তিত হয়। আমাদের দেশে সরবরাহকৃত পরিবর্তী 
ভোল্টেজের কম্পাংক 50 Hz। পরিবর্তী এই ভোল্টেজ ব্যবহার করা হয় আলোকশক্তি, তাপশক্তি উৎপাদনে এবং তড়িৎ মোটর ইত্যাদিতে। কিন্তু আমাদের দৈনন্দিন কাজে ডিসি (DC) সরবরাহের অসংখ্য প্রয়োগ রয়েছে। বিশেষ  করে ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি বা বর্তনী পরিচালনার জন্য নিরবচ্ছিন্ন একমুখী প্রবাহ বা ডিসি প্রবাহ (Direct Current) প্রয়োজন হয়।

ব্যাটারি বা শুষ্ক কোষ হলো ডিসি প্রবাহের প্রধান উৎস। কিন্তু এদের ভোল্টেজ বেশ কম এবং এগুলো প্রায়ই পরিবর্তন  করতে হয় বলে বেশ ব্যয়বহুল। অর্থাৎ ব্যাটারি দ্বারা আমাদের সব প্রয়োজন মিটানো সম্বব নয়। তাই আমাদের প্রয়োজন,  বৈদ্যুতিক সরবরাহ লাইনের দিক পরিবর্তী তথা এসি ভোল্টেজকে একমুখী তথা ডিসি ভোল্টেজ রূপান্তরিত করা। যে  প্রক্রিয়ায় এই রূপান্তরের কাজটি সম্পন্ন করা হয় তাকে বলে রেকটিফিকেশন বা একমুখীকরণ।

যে প্রক্রিয়ায় পরিবর্তী প্রবাহ (Alternating current) বা ভোল্টেজকে একমুখী প্রবাহ (Direct current) বা  ভোল্টেজে রূপান্তর করা হয় তাকে রেকটিফিকেশন বা একমুখীকরণ বলে। একমুখীকরণের কাজটি যে যন্ত্র দ্বারা সম্পন্ন  করা হয় তাকে রেফটিফায়ার বলে।
জাংশন ডায়োডের আলোচনা থেকে আমরা জেনেছি যে, ডায়োড যখন সম্মুখী ঝোঁকে থাকে তখন এর মধ্য দিয়ে তড়িৎ  প্রবাহিত হয় এবং যখন এটি বিমুখী ঝোঁকে থাকে তখন এর মধ্য দিয়ে তড়িৎ প্রবাহিত হয় না। জাংশন ডায়োডের এ  বিশেষ ধর্মকে কাজে লাগিয়ে রেকটিফিকেশন বা একমুখীকরণের কাজটি সম্পন্ন করা হয়।  একমুখীকরণে দুই ধরনের রেফটিফায়ার বর্তনী ব্যবহার করা হয়। যথাঃ
(১) অর্ধতরঙ্গ রেকটিফায়ার। 
(২) পূর্নতরঙ্গ রেকটিফায়ায়।

১০.৬.২ অর্ধতরঙ্গ রেকটিফায়ার
             Half Wave Rectifier

মূলনীতি : একটি  p-n জাংশন যখন সম্মুখী ঝোঁক প্রাপ্ত হয় তখন এর রোধ খুব কম হয়, আবার  p-n জাংশন যখন বিমুখী  ঝোঁক প্রাপ্ত হয় তখন এর রোধ খুব বেশি হয়। এ নীতির উপর ভিত্তি করে একটি অর্ধতরঙ্গ রেকটিফায়ার কাজ করে। 


১০.৬.৩ পূর্ণ তরঙ্গ রেকটিফায়ার
        (Full Wave Rectifier)




১০.৬.৪ পূর্ণ তরঙ্গ ব্রিজ রেকটিফায়ার
    (Full Wave Bridge Rectifier)



সারসংক্ষেপ :

রেকটিফিকেশন বা একমুখীকরণ: যে প্রক্রিয়ায় পরিবর্তী প্রবাহ (Alternating current) বা ভোল্টেজকে একমুখী প্রবাহ (Direct current ডিসি) বা ভোল্টেজে রূপান্তর করা হয় তাকে রেকটিফিকেশন বা একমুখীকরণ বলে। অর্ধ তরঙ্গ রেকটিফায়ার : এসি সরবরাহের একটি পূর্ণ চক্রের উপর অর্ধের জন্য লোড রোধের মধ্য দিয়েপ্রবাহ পাওয়া  গেলেও নিম্নে অর্ধেক এর জন্য কোনো প্রবাহ পাওয়া যায় না। পূর্ণ চক্রের এক অর্ধের জন্য প্রবাহ পাওয়া যায় বলে এবং  এই প্রবাহের দিক একই থাকে বলে অর্ধ তরঙ্গ রেকটিফায়ার বলে।
পূর্ণতরঙ্গ রেকটিফায়ার : অর্ধতরঙ্গ রেকটিফায়ারের ক্ষেত্রে যেখানে শুধুমাত্র অর্ধচক্রের জন্য বহির্গামী ভোল্টেজ পাওয়া  যায়, সেখানে পূর্ণতরঙ্গ রেকটিফায়ারের ক্ষেত্রে পূর্ণচক্রের জন্য বহির্গামী ভোল্টেজ পাওয়া যায় ফলে একে পূর্ণতরঙ্গ  রেকটিফায়ার বলে।

বহুনির্বাচনি প্রশ্ন

১। জাংশন ডায়োড সাধারণত কি কাজে ব্যবহার করা হয়?
(ক) সুইচ হিসেবে
(খ) রেকটিফায়ার হিসেবে
(গ) বিবর্ধক হিসেবে
(গ) স্পন্দক হিসেবে 
২। পূর্ণতরঙ্গ ব্রিজ রেকটিফায়ার বর্তনীতে ব্যবহৃত ডায়োডের সংখ্যা-
(ক) একটি
(খ) দুইটি
(গ) তিনটি
(ঘ) চারটি

পাঠ-১০.৭ : ট্রানজিস্টর ( Transistor)

এ পাঠ শেষে তুমি-
  • জাংশন ট্রানজিস্টরের গঠন ও বায়াসিং (ঝোঁক) কার্যক্রম ব্যাখ্যা করতে পারবে।
  • অ্যাম্পলিফায়ার হিসেবে ট্রানজিস্টরের ব্যবহার ব্যাখ্যা করতে পারবে।
ট্রানজিস্টর (Transistor) হচ্ছে একটি ইংরেজি শব্দ। Transfer এবং Resistor এই দুটি পৃথক ইংরেজি 
শব্দের সমন্বয়ে Transistor শব্দটি গঠিত হয়েছে। ট্রানজিস্টরকে বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার বলা যায়। 
ট্রানজিস্টরের আবিষ্কার ইলেকট্রনিক্স এর জগতে বিপ্লব সংঘটিত করেছে। ১৯৪৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বেল 
টেলিফোন ল্যাবরেটরির তিনজন গবেষক জে. বার্ডিন (J.Bardeen) , ডব্লিউ ব্রাটেন (W. Brattain) ও ডব্লিউ সক্লে  (W. Shockley) ) ট্রানজিস্টর আবিষ্কার করেন। এই গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের জন্য তিনজনকে ১৯৫৬ সালে পদার্থবিজ্ঞানে  নোবেল পুরষ্কার প্রদান করা হয়। ট্রানজিস্টর দুর্বল তড়িৎ সংকেতকে বিবর্ধন করতে পারে এবং উচ্চগতিসম্পন্ন সুইচ  হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
সংজ্ঞাঃ দুটি একই ধরনের অর্ধপরিবাহীর (n-টাইপ অথবা p-টাইপ) মাঝখানে এদের বিপরীত ধরনের (p-টাইপ অথবা n-টাইপ) অর্ধপরিবাহী বিশেষ প্রক্রিয়ায় পরস্পরের সাথে যুক্ত করে যে যন্ত্র বা কৌশল (Device) তৈরি করা হয় তাকে  ট্রানজিস্টর বলে।
সুতরাং একটি জাংশন ট্রানজিস্টর দুটি p-n জাংশনের সমন্বয়ে গঠিত এবং এর তিনটি প্রান্ত রয়েছে।
গঠন ও প্রকৃতি অনুসারে জাংশন ট্রানজিস্টর দুই প্রকারঃ 
(1) p-n-p ট্রানজিস্টর এবং
(2) n-p-n ট্রানজিস্টর।



১০.৭.২ জাংশন ট্রানজিস্টরের বায়াসিং ও কার্যপদ্ধতি বা কার্যক্রম  (Biasing of Junction Transistor and Working Procedure)




অ্যাম্পলিফায়ার বা বিবর্ধক হিসেবে ট্রানজিস্টর (Transistor    as an Amplifier)

যে যন্ত্র তার ইনপুটে (Input) প্রদত্ত সংকেতকে আউটপুটে (Output) বিবর্ধিত করে তাকে অ্যামপ্লিফায়ার বা বিবর্ধক বলে। ইলেকট্রনিক এম্পলিফায়ার দুর্বল অন্তর্গামী (Input) সংকেতকে বৃহৎ বহির্গামী (Output) সংকেতে পরিণত করে। ট্রানজিস্টর  বিবর্ধক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। (১০.২৩) চিত্রে একটি সাধারণ এমিটার বিবর্ধকের বর্তনী দেখানো হয়েছে। ইনপুট সার্কিটে  বেস ও এমিটারের মধ্যে একটি ডিসি ভোল্টেজ (Vbb) প্রয়োগ করা হয় যাতে এমিটার-বেস জাংশন সর্বদা সম্মুখী বায়াসে  থাকে। সুতরাং ইনপুট এসি সিগনালের নেগেটিভ অর্ধচক্রের সময়ও জাংশন সন্মুখ বায়াসে থাকে। আউটপুট বর্তনীতে Vcc ব্যাটারির সাহায্যে কালেক্টর ও এমিটারের মধ্যে বিমুখী বায়াস প্রদান করা হয়।

দশা পরিবর্তন  (Phase reversal) : সাধারণ এমিটার বর্তনীতে, যখন এসি ইনপুট ভোল্টেজ ধনাত্মক দিকে বাড়তে থাকে,  তখন এসি আউটপুট ভোল্টেজ ঋণাত্মক দিকে বৃদ্ধি পেতে থাকে। আবার এসি ইনপুট ভোল্টেজ যখন ঋণাত্মক দিকে  বাড়তে থাকে, তখন এসি আউটপুট ভোল্টেজ ধনাত্মক দিকে বৃদ্ধি পেতে থাকে। অর্থাৎ সাধারণ এমিটার ব্যবস্থায়, ইনপুট  ও আউটপুট ভোল্টেজের মধ্যে সর্বদা ১৮০ ডিগ্রি দশা পার্থক্য বজায় থাকে।

ট্রানজিস্টর অ্যামপ্লিফায়ার এর ব্যবহার :
১। ইন্টারকমে ব্যবহার করা হয়।
২। রেডিওতে ব্যবহার করা হয়।
৩। মাইকে ব্যবহার করা হয়।
৪। অ্যালার্ম বর্তনীতে ব্যবহার করা হয়।








সারসংক্ষেপ :


বহুনির্বাচনি প্রশ্ন

১। ট্রানজিস্টরের মাঝখানের অর্ধপরিবাহীকে কী বলে?
(ক) বেস বা পীঠ (খ) নিঃসরক (গ) সংগ্রাহক (গ) দাতা
২। কোন ট্রানজিস্টর সাধারণ পীঠ সংযোগে রয়েছে এর পীঠ প্রবাহ 0.05 mA এবং সংগ্রাহক প্রবাহ 0.95 mA হলে, 
ট্রানজিস্টরের নিঃসরক প্রবাহ কত?
(ক) 0.85 mA (খ) 0.90 mA (গ) 1.0 mA (ঘ) 1.5 mA

পাঠ-১০.৮ : বিভিন্ন ধরনের নম্বর পদ্ধতি 

   ( Different Types of Number System)

এ পাঠ শেষে তুমি-
  • বাইনারি নম্বর পদ্ধতি ব্যাখ্যা করতে পারবে।
  • ডেসিমেল নম্বর পদ্ধতি ব্যাখ্যা করতে পারবে।
  • অক্টাল নম্বর পদ্ধতি ব্যাখ্যা করতে পারবে।
  • হেক্সাডেসিমেল নম্বর পদ্ধতি ব্যাখ্যা করতে পারবে।
১০.৮.১ নম্বর পদ্ধতি : মানব সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই মানুষ হিসাব বা গণনা করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। মূলত তখন থেকেই প্রয়োজনের তাগিদে গণনা করার বিভিন্ন পদ্ধতি উদ্ভাবিত হতে থাকে। হাতের আঙ্গুল, দড়ির গিট, মাটিতে দাগ কাটা ইত্যাদির সাহায্যে মানুষ প্রথম গণনা শুরু করে। সভ্যতা বিকাশের সাথে সাথে গণনার জন্য মানুষ বিভিন্ন সাংকেতিক চিহ্ন ব্যবহার করতে শুরু করে।

যেমন : রোমানরা পাঁচ এর জন্য ‘V’ ব্যবহার করত, দশ এর জন্য ‘X’ ব্যবহার করত। এভাবে গণনা বা হিসাবের প্রয়োজনে বিভিন্ন সাংকেতিক চিহ্ন, বর্ণ, সংখ্যা ইত্যাদি প্রচলন শুরু হয়। সাংকেতিক চিহ্নসমূহ ব্যবহার করে কোনো কিছুর পরিমাপ করার কৌশলই হলো গণনা।এই সাংকেতিক চিহ্নসমূহকে নম্বর বা সংখ্যা বলে।

যে পদ্ধতির মাধ্যমে নম্বর বা সংখ্যা লেখা বা প্রকাশ এবং গণনা করা হয় তাকে সংখ্যা বা নম্বর পদ্ধতি বলে।

সংখ্যা পদ্ধতির ভিত (Base of number System)
যেকোনো সংখ্যা পদ্ধতিতে ব্যবহৃত মৌলিক চিহ্নসমূহের মোট সংখ্যাকে ঐ সংখ্যা পদ্ধতির ভিত বা বেস বলে। যেমন দশমিক বা ডেসিমেল পদ্ধতিতে দশটি মৌলিক চিহ্ন আছে। এগুলো হলো- ০, ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৮, ৯। সুতরাং এ পদ্ধতির ভিত্তি বা বেস হলো ১০। কোনো নম্বর পদ্ধতির ভিত্তি হচ্ছে ঐ পদ্ধতিতে ব্যবহৃত মৌলিক প্রতীক সমূহের মোট  সংখ্যা। যেমন - দশমিক পদ্ধতির ভিত্তি হলো ১০, কারণ ঐ পদ্ধতিতে দশটি মৌলিক চিহ্ন বা প্রতীক আছে। 

একই ভাবে  বলা যায়, বাইনারি, অক্টাল ও হেক্সাডেসিমেল পদ্ধতিগুলো হলো যথাক্রমে ২ ভিত্তিক, ৮ ভিত্তিক ও ১৬ ভিত্তিক নম্বর পদ্ধতি।সংখ্যা পদ্ধতির বেস বা ভিতের ওপর নির্ভর করে পজিশনাল সংখ্যা পদ্ধতি বিভিন্ন ধরনের হতে পারে।স্থানিক সংখ্যা পদ্ধতিতে প্রতিটি সংখ্যায় ব্যবহৃত অঙ্কগুলোর প্রত্যেকটির একটি স্থানিক মান থাকে। এ ধরনের সংখ্যা পদ্ধতি চার ধরনের। যথা -
(১) ডেসিমেল বা দশমিক সংখ্যা পদ্ধতি (Decimal Number System)
(২) বাইনারি সংখ্যা পদ্ধতি (Binary Number System)
(৩) অক্টাল সংখ্যা পদ্ধতি  (Octal Number System)
(৪) হেক্সাডেসিমেল সংখ্যা পদ্ধতি (Hexa-Decimal Number System)

নিচে এগুলো সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।

১। ডেসিমেল বা দশমিক সংখ্যা পদ্ধতি (Decimal Number System)
আমাদের দৈনন্দিন হিসাব-নিকাশের জন্য বহুল ব্যবহৃত নম্বর পদ্ধতি হলো ডেসিমেল নম্বর বা দশমিক সংখ্যা পদ্ধতি।  ডেসিমেল নম্বর পদ্ধতির ভিত্তি (ইধংব) হলো ১০। কারণ এই পদ্ধতিতে ১০ টি মৌলিক প্রতীক ব্যবহার করা হয়। প্রতীকগুলো হলো ০,১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৮ ও ৯। এ পদ্ধতিতে মোট দশটি প্রতীক (অঙ্ক) ব্যবহার করা হয়, বলে এ নম্বর  পদ্ধতিকে ডেসিমেল বা দশমিক নম্বর পদ্ধতি বলা হয়।


স্থানীয় মান : কোনো সংখ্যার প্রতিটি অংকের মান নির্ণয়ের জন্য নিম্নে বর্ণিত তথ্য জানা প্রয়োজন।
(i) অংকটির নিজস্ব মান,
(ii) অংকটির অবস্থান বা স্থানীয় মান 
(iii) ঐ নম্বর পদ্ধতির বেস বা ভিত্তি।
ডেসিমেল নম্বর পদ্ধতির একটি সংখ্যা ১২৩.৪৫ বিবেচনা করা যাক। এই সংখ্যাটিতে দশমিকের পূর্বের অংশ পূর্ণমান  নির্দেশ করে এবং পরের অংশ ভগ্নাংশ নির্দেশ করে। ডেসিমেল নম্বর পদ্ধতিতে অবস্থানের ওপর অংকের স্থানীয় মান নির্ভর  করে।  

২। বাইনারি সংখ্যা পদ্ধতি (Binary Number System)
বাই (ইর) মানে দুই। বাইনারি সংখ্যা পদ্ধতিতে ০ এবং ১ এ দুটি অংক ব্যবহার করা হয়। এ সংখ্যা পদ্ধতির ভিত্তি বা বেস  হলো ২ । এ পদ্ধতিতে ব্যবহৃত অংক ০ এবং ১ কে Binary Digit বা সংক্ষেপে বিট (bit) বলে। কম্পিউটারে ডেটা ও  তথ্য সংরক্ষণে এবং ডেটা কমিউনিকেশনে বিট মৌলিক একক হিসেবে কাজ করে। আটটি বিটের সমন্বয়ে এক বাইট  (byte) গঠিত হয়।

বাইনারি পদ্ধতিতে এই দুইটি প্রতীক ০ এবং ১ ব্যবহার করে আমরা যেকোনো সংখ্যাকে প্রকাশ করতে পারি, যা ডেসিমেল  পদ্ধতিতে ১০ টি প্রতীক ব্যবহার করে প্রকাশ করা হয়। বাইনারি পদ্ধতিতে কেবল মাত্র দুই এর বিভিন্ন শক্তি বিশিষ্ঠ পদের  সমষ্ঠি দিয়েই নম্বর বা সংখ্যা গঠন করা হয়।  বাইনারি পদ্ধতি হলো সবচেয়ে সরল গণনা পদ্ধতি।

 তবে বাইনারি গণনায় ডেসিমেল পদ্ধতির তুলনায় বেশি অংকের  দরকার হয় বলে সাধারণ ক্ষেত্রে এটির ব্যবহার অসুবিধাজনক। কিন্তু ইলেকট্রনিক যন্ত্রে এক সাথে অনেক বাইনারি অংক  দ্বারা দ্রুতগতিতে গাণিতিক ডেটা প্রক্রিয়াকরণ সম্ভব হয়। তাই ইলেকট্রনিক যন্ত্রে বিশেষ করে কম্পিউটারে বাইনারি পদ্ধতি  ব্যবহৃত হয়।

 নিচের সারণিতে ডেসিমেল নম্বরের সমতুল্য বাইনারি সংখ্যা দেখানো হলো।

৩। অকটাল সংখ্যা পদ্ধতি (Octal Number System)
অকটাল সংখ্যা পদ্ধতির ভিত্তি হলো ৮ , কেননা এই পদ্ধতিতে ব্যবহৃত মৌলিক প্রতীকের সংখ্যা আটটি। প্রতীকগুলো  হলো ০, ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬ ও ৭ । অর্থাৎ অক্টাল নম্বরের যে কোনো ডিজিট ০ হতে ৭ পর্যন্ত হতে পারে। আধুনিক  কম্পিউটার উন্নয়নের প্রথম দিকে এ পদ্ধতি অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। ১০.২ সারণিতে অকটাল পদ্ধতির গণনারীতি দেখানো  হলো-

৪। হেক্সাডেসিমেল সংখ্যা পদ্ধতি (Hexa-Decimal Number System)
হেক্সাডেসিমেল সংখ্যা পদ্ধতির ভিত্তি বা বেস হলো ১৬ । এই পদ্ধতিতে ১৬ টি মৌলিক প্রতিক ব্যবহার করা হয়। এগুলো  হলো : ০, ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৮, ৯, A, B, C, D, E ও F । এখানে ১০ হতে ১৫ ডিজিটগুলোকে A, B, C, D, E ও F দ্বারা বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ A = ১০, B = ১১, C = ১২, D = ১৩, E = ১৪, এবং F = ১৫। 
হেক্সডিসিমেল নম্বর পদ্ধতি সকল প্রকার কস্পিউটারে ব্যবহার করা হয়।




















বহুনির্বাচনি প্রশ্ন


পাঠ-১০.৯ বাইনারি ও বুলিয়ান অপারেশন 

(Binary and Boolean Operation )

এ পাঠ শেষে তুমি-
  • বাইনারি অপারেশন ব্যাখ্যা করতে পারবে।
  • বুলিয়ান অপারেশন ব্যাখ্যা করতে পারবে।
১০.৯.১ বাইনারি অপারেশন  Binary Operation
ডেসিমেল পদ্ধতির গাণিতিক অপারেশনসমূহ বা প্রক্রিয়াসমূহ (যেমন- যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ ইত্যাদি)  আমাদের নিকট অতি পরিচিত। এ ধরনের গাণিতিক অপারেশনসমূহ বাইনারি নম্বর পদ্ধতির ক্ষেত্রেও  প্রযোজ্য। বাইনারি পদ্ধতির গাণিতিক অপারেশনসমূহ অন্যান্য পদ্ধতির তুলনায় অধিকতর সহজ, কারণ এ  ক্ষেত্রে মাত্র দুটি মৌলিক প্রতীক 0 এবং ১ ব্যবহৃত হয়। এখন আমরা বাইনারি যোগ, বিযোগ, গুণ ও ভাগ অপারেশন  সর্ম্পকে আলোচনা করব।

১। বাইনারি যোগ (Binary Addition)
বাইনারি যোগ অনেকটাই ডেসিমেল বা দশমিক যোগের অনুরূপ। বাইনারি যোগের সময় নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করতে হয়। 
প্রথম ধাপ : বাইনারি যোগের সময় প্রথমে সর্ব ডানের কলাম যোগ করতে হয়।
দ্বিতীয় ধাপ : প্রথম কলাম যোগ করে যোগফল প্রথম কলামের নিচে লিখতে হয়। যদি ক্যারি (Carry) উৎপন্ন হয়, তবে  তা পরের কলামে বসাতে হবে এবং পরের কলামে কোনো ডিজিট থাকলে তার সাথে ক্যারি যোগ করতে হবে। এ প্রক্রিয়া  চলতে থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত বাম দিকে কোনো কলাম না থাকে।
বাইনারি যোগের ক্ষেত্রে নিচের নিয়মগুলো প্রযোজ্য: 
০ + ০ = ০
০ + ১ = ১
১ + ০ = ১
১ + ১ = ০ এবং হাতে ১ থাকবে অর্থাৎ ক্যারি ১ অর্থাৎ ১০। এই হাতে থাকাকে ক্যারি (Carry) বলে।
১+১+১=১ এবং ক্যারি ১। অর্থাৎ ক্যারি ১১।

গাণিতিক উদাহরণ : (১১০০১.১০১)২ + (১০১০১.০১০)২ = ?
সমধান : 
১১০০১.১০১
১০১০১.০১০
 ১০১১১০.১১১
উত্তর : (১০১১১০.১১১)২

২। বাইনারি বিয়োগ
বাইনারি নম্বর পদ্ধতিতে বিয়োগের নিয়ম অনেকটাই ডেসিমেল পদ্ধতির অনুরূপ। পার্থক্য এই যে, বাইনারি পদ্ধতিতে  যেহেতু মাত্র দুটি ডিজিট (০ এবং ১) থাকে, তাই বাইনারি বিয়োগে ডেসিমেল বিয়োগের থেকে কিছু বেশি ধার করার ধারণা  থাকে। বাইনারি বিয়োগের ক্ষেত্রে নিচের নিয়মগুলো প্রযোজ্যঃ 
১. ০-০ = ০
২. ১-০ = ১
৩. ১–১= ০
৪. ০-১=১ এবং ক্যারি ১।
এ পদ্ধতিতেও ডেসিমেল পদ্ধতির মতো ছোট সংখ্যা থেকে বড় সংখ্যা বিয়োগ করলে ধার নিতে হয়। যেমন- ০ থেকে ১ বিয়োগ করার জন্য ১ ধার নিতে হয়েছে। কম্পিউটারে এই পদ্ধতিতে বিয়োগ করা হয় না । বিশেষ পদ্ধতিতে যোগের  সাহায্যে বিয়োগ করা হয়।

গাণিতিক উদাহরণ : (১০১০১)২ থেকে (১১০১)২ বিয়োগ কর। 
১০১০১ –১১০১= ০১০০০ 
উঃ (০১০০০)২


বহুনির্বাচনি প্রশ্ন

পাঠ-১০.১০ : লজিক গেইট  ( Logic Gate) 

লজিক গেট হলো লজিক বর্তনী তৈরির মূল উপাদান। লজিক বর্তনী হলো একটি ডিজিটাল বর্তনী।
বুলিয়ান অ্যালজেবরার ব্যবহারিক প্রয়োগের জন্য ডিজিটাল ইলেকট্রনিক সার্কিট ব্যবহার করা হয়। লজিক  গেট হলো এক ধরনের ইলেকট্রনিক বর্তনী যার সাহায্যে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত গঠন করা যায়। এসব ডিজিটাল ইলেকট্রনিক বর্তনীকে লজিক গেইট বলে।

একটি লজিক গেট -এ এক বা একাধিক ইনপুট থাকতে পারে। কিন্তু একটিমাত্র আউটপুট থাকে। এই বর্তনীতে ইনপুট ও  আউটপুটের মধ্যে যৌক্তিক সম্পর্ক বিদ্যমান। তাই এদের বলা হয় লজিক গেট।
সুতরাং লজিক গেট বা যুক্তি বর্তনী হলো এক ধরনের ইলেকট্রনিক বর্তনী যা এক বা একাধিক বাইনারি ইনপুট ( 1 এবং ০)  গ্রহণ করে এবং একটি আউটপুট প্রদান করে। লজিক গেট ক্যালকুলেটর, কম্পিউটার, রোবট, মোবাইল, টেলিফোন  ইত্যাদিতে ব্যবহার করা হয়।

ট্রুথ টেবিল বা সত্যক সারণি: লজিক গেটে ইনপুট এবং আউটপুট ভোল্টেজের বিভিন্ন সম্ভাব্য মানের মধ্যে সর্ম্পক একটি  টেবিল বা সারণির সাহায্য প্রকাশ করা হয়। এ টেবিলকে ট্রুথ টেবিল বা সত্যক সারণি বলা হয়।

লজিক গেটের প্রকারভেদ









বহুনির্বাচনি প্রশ্ন

পাঠ ১০.১১ গেটের সমবায় (Combination of Gates)








 বহুনির্বাচনী প্রশ্ন উত্তর

পাঠোত্তর মূল্যায়ন ১০.১ : ১. (গ) ২. (গ) 
পাঠোত্তর মূল্যায়ন ১০.২ : ১. (গ) ২. (ক) 
পাঠোত্তর মূল্যায়ন ১০.৩ : ১. (গ) ২. (গ) 
পাঠোত্তর মূল্যায়ন ১০.৪ : ১. (গ) ২. (ক) 
পাঠোত্তর মূল্যায়ন ১০.৫ : ১. (ক) ২. (খ) 
পাঠোত্তর মূল্যায়ন ১০.৬ : ১. (খ) ২. (ঘ) 
পাঠোত্তর মূল্যায়ন ১০.৭ : ১. (ক) ২. (গ) 
পাঠোত্তর মূল্যায়ন ১০.৮ : ১. (খ) ২. (খ) 
পাঠোত্তর মূল্যায়ন ১০.৯ : ১. (খ) ২. (ক) 
পাঠোত্তর মূল্যায়ন ১০.১০ : ১. (গ) ২. (ক) 
পাঠোত্তর মূল্যায়ন ১০.১১ : ১. (খ) ২. (খ)

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনেট আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url